পশ্চিমবঙ্গে জমি ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন খরচ ২০২৬: স্ট্যাম্প ডিউটি ও ফি-এর সম্পূর্ণ গাইড
![]() |
| পশ্চিমবঙ্গে জমি ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন খরচ ২০২৬: স্ট্যাম্প ডিউটি, রেজিস্ট্রেশন ফি, হিসাব ও অনলাইন পেমেন্টের সম্পূর্ণ গাইড। |
আপনি যদি পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবার জমি, ফ্ল্যাট বা বাড়ি কেনার কথা ভাবছেন, তবে প্রপার্টির মূল দামের পাশাপাশি আপনাকে আরও দুটি বড় খরচের হিসাব মাথায় রাখতে হবে—স্ট্যাম্প ডিউটি এবং রেজিস্ট্রেশন ফি।
অনেকেই না জেনে বাজেট তৈরি করেন এবং পরে সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে গিয়ে বিপদে পড়েন। আবার অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে, "আমি তো কম দামে জমি কিনছি, তাহলে সরকারি বাজার মূল্যের ওপর কেন ট্যাক্স দেব?"
এই আর্টিকেলে আমরা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রেজিস্ট্রেশন দপ্তরের (Directorate of Registration & Stamp Revenue) অফিসিয়াল আইন ও বিজ্ঞপ্তির ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি বিষয় একেবারে সহজ বাংলায় আলোচনা করব।
১. স্ট্যাম্প ডিউটি এবং রেজিস্ট্রেশন ফি কী?
সম্পত্তি কেনাবেচার আইনি প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ করতে এই দুটি সরকারি চার্জ দেওয়া বাধ্যতামূলক:
- স্ট্যাম্প ডিউটি (Stamp Duty): স্ট্যাম্প ডিউটি হলো এক ধরনের সরকারি কর (Tax), যা দ্য ইন্ডিয়ান স্ট্যাম্প অ্যাক্ট, ১৮৯৯ (The Indian Stamp Act, 1899)-এর অধীনে প্রপার্টি কেনাবেচা বা হস্তান্তরের সময় রাজ্য সরকারকে দিতে হয়। এটি আপনার নামে ওই সম্পত্তির আইনি অধিকার বা মালিকানা প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
- রেজিস্ট্রেশন ফি (Registration Fee): রেজিস্ট্রেশন ফি হলো সরকারি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে (ADSR) আপনার দলিলটি সরকারি রেকর্ডে স্থায়ীভাবে নথিভুক্ত (Record) করার জন্য প্রদেয় একটি সার্ভিস চার্জ। এটি রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট, ১৯০৮-এর অধীনে নেওয়া হয়।
Market Value vs Consideration Value: সরকার কীভাবে হিসাব করে?
ওয়েস্ট বেঙ্গল স্ট্যাম্প (প্রিভেনশন অফ আন্ডার-ভ্যালুয়েশন অফ ইনস্ট্রুমেন্টস) রুলস, ২০০১ অনুযায়ী, স্ট্যাম্প ডিউটি সর্বদা Market Value (বাজার মূল্য) এবং Consideration Value (চুক্তিমূল্য)-এর মধ্যে যেটি বেশি, তার ওপর ধার্য করা হয়।- বাস্তব উদাহরণ: যদি আপনি কোনো প্রপার্টি বাস্তবে ৪০ লক্ষ টাকায় কেনেন (Consideration Value), কিন্তু সরকারের রেকর্ডে সেটির ন্যূনতম বাজার মূল্য ৫০ লক্ষ টাকা (Market Value) হয়, তবে আপনাকে ওই ৫০ লক্ষ টাকার ওপরই স্ট্যাম্প ডিউটি দিতে হবে।
২. ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে স্ট্যাম্প ডিউটি ও রেজিস্ট্রেশন ফি-এর বর্তমান হার
জরুরি আইনি আপডেট: করোনা মহামারীর সময় পশ্চিমবঙ্গ সরকার স্ট্যাম্প ডিউটিতে যে ২% ছাড় এবং সার্কেল রেটে ১০% ছাড় ঘোষণা করেছিল, তা অর্থ দপ্তরের বিজ্ঞপ্তি (Notification No. 997-F.T.) অনুযায়ী সম্পূর্ণ বাতিল হয়ে গেছে। বর্তমানে প্রপার্টি রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের পূর্বের মূল রেটই প্রযোজ্য হচ্ছে।অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (wbregistration.gov.in) অনুযায়ী Sale Deed বা বিক্রয় দলিলের জন্য বর্তমান রেট নিচে টেবিলের মধ্যে দেওয়া হলো:
৩. বিভিন্ন দলিলের ক্ষেত্রে স্ট্যাম্প ডিউটির নিয়ম
শুধু সাধারণ কেনাবেচা (Sale Deed) নয়, সম্পত্তির অন্যান্য হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে:
- Gift Deed (দানপত্র): পরিবারের সদস্যদের (যেমন- স্বামী, স্ত্রী, বাবা, মা, ছেলে, মেয়ে) মধ্যে সম্পত্তি দান করলে স্ট্যাম্প ডিউটির ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় থাকে (সাধারণত মার্কেট ভ্যালুর ০.৫%)।
- Agreement for Sale (বায়নানামা): আপনি যদি আন্ডার-কনস্ট্রাকশন ফ্ল্যাট বা জমির জন্য অ্যাগ্রিমেন্ট করেন, তবে দ্য ফাইন্যান্স অ্যাক্ট ২০১৭ অনুযায়ী স্ট্যাম্প ডিউটি মার্কেট ভ্যালুর ২%। পরে ফাইনাল ডিড করার সময় বাকি স্ট্যাম্প ডিউটি অ্যাডজাস্ট করা হয়।
- Partition / Settlement / Release Deed: এগুলোর ক্ষেত্রে সাধারণত বাজার মূল্যের ০.৫% হারে স্ট্যাম্প ডিউটি লাগে।
৪. হিসাবের বাস্তব উদাহরণ (Illustrative Calculations)
উদাহরণ ১: পঞ্চায়েত এলাকায় ২০ লক্ষ টাকার জমি
ধরা যাক, আপনি পঞ্চায়েত এলাকায় একটি জমি কিনছেন যার সরকারি বাজার মূল্য ২০ লক্ষ টাকা এবং চুক্তিমূল্য ১৮ লক্ষ টাকা।
- বিবেচ্য মূল্য: ২০ লক্ষ টাকা (যেহেতু সরকারি বাজার মূল্য বেশি)
- স্ট্যাম্প ডিউটি (৫%): ১,০০,০০০ টাকা
- রেজিস্ট্রেশন ফি (১%): ২০,০০০ টাকা
- মোট সরকারি খরচ: ১,২০,০০০ টাকা
![]() |
| পঞ্চায়েত এলাকায় ₹20,00,000 Market Value অনুযায়ী Stamp Duty & Registration fees Calculator ফলাফল |
উদাহরণ ২: কলকাতা কর্পোরেশন এলাকায় ৫০ লক্ষ টাকার ফ্ল্যাট
ধরা যাক, কলকাতায় একটি ফ্ল্যাটের বাজার মূল্য ৫০ লক্ষ টাকা।
- স্ট্যাম্প ডিউটি (৬% - ৪০ লক্ষ থেকে ১ কোটির স্ল্যাবে ১% ছাড়সহ): ৩,০০,০০০ টাকা
- রেজিস্ট্রেশন ফি (১%): ৫০,০০০ টাকা
- মোট সরকারি খরচ: ৩,৫০,০০০ টাকা
![]() |
| কলকাতার পৌরসভা এলাকার ₹50,00,000 Market Value অনুযায়ী Stamp Duty ও Registration Fee Calculator |
৫. নিজে কীভাবে Market Value এর স্ট্যাম্প ডিউটি ও ফি চেক করবেন?
কারোর ওপর ভরসা না করে আপনি নিজেই পশ্চিমবঙ্গ রেজিস্ট্রেশন দপ্তরের অফিশিয়াল পোর্টাল থেকে প্রপার্টির মার্কেট ভ্যালু এবং ডিউটি হিসাব করতে পারেন।
ধাপ ১: অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে যান
প্রথমে আপনার ফোনের ব্রাউজার থেকে wbregistration.gov.in ওয়েবসাইটে যান। হোমপেজটি খুললে স্ক্রিনে বেশ কিছু অপশন দেখতে পাবেন।
ধাপ ২: Calculation Assistance অপশনটি বেছে নিন
হোমপেজের একটু নিচের দিকে বামপাশে "Calculation Assistance" নামের একটি বক্স দেখতে পাবেন (নিচের ছবিতে লাল বর্ডার দিয়ে চিহ্নিত অংশ)। এই অপশনটিতে ক্লিক করুন।
ধাপ ৩: Stamp Duty & Registration Fee সিলেক্ট করুন
"Calculation Assistance"-এ ক্লিক করার পর স্ক্রিনে একটি পপ-আপ মেনু আসবে। সেখানে সবার নিচে থাকা "Stamp Duty & Registration Fee" অপশনটিতে ক্লিক করুন।
ধাপ ৪: ক্যালকুলেটর ফর্মটি পূরণ করুন
এবার আপনার সামনে আসল ক্যালকুলেটর পেজটি খুলে যাবে। এখানে নিচের নির্দেশিকা অনুযায়ী তথ্যগুলো ড্রপডাউন মেনু থেকে সিলেক্ট করুন:
- Transaction Major: এখানে ক্লিক করে 'Sale' সিলেক্ট করুন।
- Transaction Minor: এখানে ক্লিক করে 'Sale Document' সিলেক্ট করুন (সাধারণ জমি বা ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে)।
- Local Body: আপনার সম্পত্তিটি কোন এলাকায় অবস্থিত (যেমন- Gram Panchayat, Municipality, বা Kolkata Municipal Corporation) তা সিলেক্ট করুন।
- Market Value: এই ঘরটিতে আপনার সম্পত্তির সরকারি বাজার মূল্য (Market Value) কত টাকা, তা সংখ্যায় লিখুন (যেমন- ২০ লক্ষ টাকার জন্য 2000000 লিখবেন, শূন্য দেওয়ার সময় সতর্ক থাকুন)।
- Captcha Code: ক্যাপচা বক্সে যে কোডটি দেখতে পাচ্ছেন, সেটি দেখে দেখে নিচের ফাঁকা বক্সে হুবহু টাইপ করুন।
ধাপ ৫: 'Display' বাটনে ক্লিক করুন
সব তথ্য এবং ক্যাপচা কোডটি সঠিকভাবে ইনপুট করার পর, ফর্মের একদম নিচে থাকা "Display" বাটনে ক্লিক করুন।
ব্যাস, কাজ শেষ! ডিসপ্লে বাটনে ক্লিক করার সাথে সাথেই স্ক্রিনের নিচে আপনার ওই সম্পত্তির জন্য ঠিক কত টাকা Stamp Duty এবং কত টাকা Registration Fee দিতে হবে, তা টাকার অঙ্কে পরিষ্কারভাবে দেখতে পাবেন।
৬. কীভাবে অনলাইনে স্ট্যাম্প ডিউটি ও রেজিস্ট্রেশন ফি জমা দেবেন?
অফিসিয়াল বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, যদি স্ট্যাম্প ডিউটি ১০,০০০ টাকার বেশি অথবা রেজিস্ট্রেশন ফি ৫,০০০ টাকার বেশি হয়, তবে ই-পেমেন্ট (E-Payment) বাধ্যতামূলক।
পশ্চিমবঙ্গে প্রপার্টি রেজিস্ট্রেশনের জন্য তৈরি হওয়া ই-অ্যাসেসমেন্ট স্লিপ বা কোয়েরি নম্বর (Query Number) ব্যবহার করে কীভাবে নিজের মোবাইল বা কম্পিউটার থেকে সরকারি ফি অনলাইনে জমা করবেন, তা নিচে ধাপে ধাপে দেখানো হলো:ধাপ ১: e-Payment and Refund অপশনটি বেছে নিন
প্রথমে wbregistration.gov.in পোর্টালের হোমপেজে যান। সেখানে থাকা "e-Payment and Refund" অপশনটিতে ক্লিক করুন।
![]() |
| Directorate of Registration and Stamp Revenue-এর e-Payment and Refund অপশন |
ধাপ ২: e-Payment অফ Stamp Duty & Regn. Fees সিলেক্ট করুন
একটি পপ-আপ মেনু আপনার সামনে আসবে। সেখান থেকে প্রথম অপশন অর্থাৎ "e-Payment of Stamp Duty & Regn. Fees"- তে ক্লিক করুন।
![]() |
| Stamp Duty ও Registration Fee e-Payment নির্বাচন করার স্ক্রিন |
ধাপ ৩: কোয়েরি নম্বর ও সিকিউরিটি কোড দিন
এবার যে পেজটি খুলবে, সেখানে আপনার ই-রিকুইজিশন ফর্ম জেনারেট করার পর পাওয়া তথ্যাদি ইনপুট করুন:
- Query No: আপনার অ্যাসেসমেন্ট স্লিপে থাকা ১০ ডিজিটের কোয়েরি নম্বরটি লিখুন।
- Query Year: যে বছর আবেদন করছেন (যেমন- 2026) তা লিখুন।
- Security Code: নিচে বক্সে দেখানো কোডটি (যেমন চিত্রে R7X6C4) দেখে দেখে টাইপ করুন।
- এরপর নিচে স্ক্রোল করে "Proceed" বাটনে ক্লিক করুন।
![]() |
| Enter Query Number, Query Year and Security Code. |
ধাপ ৪: প্রদেয় ফি যাচাই করুন
পরের স্ক্রিনে আপনার কোয়েরি নম্বরের বিপরীতে মোট কত টাকা সরকারি ফি দিতে হবে, তার একটি ব্রেক-আপ (Stamp Duty, Registration Fees এবং User Charges) দেখতে পাবেন। মোট অংকটি মিলিয়ে দেখে নিয়ে নিচে থাকা নীল রঙের "Confirm" বাটনে ক্লিক করুন।
![]() |
| Verify payment details and confirm. |
ধাপ ৫: জমাকারীর বিবরণ (Depositor Details) পূরণ করুন
এখানে যিনি টাকা জমা দিচ্ছেন, তার নাম (First Name ও Last Name), সম্পূর্ণ ঠিকানা (Address), সচল মোবাইল নম্বর (Mobile No) এবং ইমেল আইডি সঠিকভাবে টাইপ করুন।
![]() |
| Fill depositor details before payment. |
ধাপ ৬: ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিবরণ দিন
টাকা পেমেন্ট করার জন্য আপনার একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ডিটেইলস দিতে হবে।
নোট: ভবিষ্যতে কোনো কারণে যদি এই পেমেন্ট রিফান্ড (Refund) বা ফেরত নিতে হয়, তবে টাকা সরাসরি এই অ্যাকাউন্টে এসে জমা হবে।
এখানে ব্যাংকের নাম, ব্রাঞ্চের নাম, অ্যাকাউন্ট নম্বর, অ্যাকাউন্টের ধরন (Savings/Current) এবং IFSC কোড সঠিকভাবে লিখে ফর্মটি এগিয়ে নিয়ে যান।
![]() |
| Enter bank account details. |
ধাপ ৭: GRIPS ২.০ পোর্টালে ভেরিফাই করুন
এবার আপনাকে সরাসরি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের GRIPS 2.0 গেটওয়েতে রিডাইরেক্ট করা হবে। সেখানে আপনার প্রদেয় মোট টাকার অংকটি দেখাবে। নিচে থাকা "Verified and checked" চেক বক্সে টিক চিহ্ন দিন এবং "NEXT" বাটনে ক্লিক করুন। এরপর আপনার সুবিধাজনক পেমেন্ট মোড (Net Banking, Debit Card, বা UPI) সিলেক্ট করে পেমেন্ট সম্পূর্ণ করুন।
![]() |
| Review payment amount breakdown. |
ধাপ ৮: ই-চালান (e-Challan) ডাউনলোড করুন
পেমেন্ট সফলভাবে সম্পন্ন হলে স্ক্রিনে "Payment successful!" মেসেজ এবং একটি ইউনিক Payment ID দেখতে পাবেন। এবার নিচে থাকা "DOWNLOAD CHALLAN" বাটনে ক্লিক করে আপনার ই-চালানটির পিডিএফ (PDF) ফাইল ফোনে বা কম্পিউটারে সেভ করে নিন।
![]() |
| Payment successful and download challan. |
জরুরি নির্দেশ: এই ডাউনলোড করা ই-চালানটি (e-Challan) অবশ্যই প্রিন্ট আউট করে নেবেন। সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে (ADSR) দলিলের মূল রেজিস্ট্রেশনের দিন এই প্রিন্ট কপিটি জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।
৭. রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস
সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে (ADSR) প্রসেস
- অনলাইনে ই-রিকুইজিশন (e-Requisition) ফর্ম ফিলাপ করা ও কোয়েরি নম্বর জেনারেট করা।
- কোয়েরি নম্বর দিয়ে স্ট্যাম্প ডিউটি এবং রেজিস্ট্রেশন ফি ই-পেমেন্ট করা।
- অনলাইনে e-Appointment বা রেজিস্ট্রেশনের দিন ও সময় বুক করা।
- নির্ধারিত দিনে বিক্রেতা, ক্রেতা এবং সাক্ষীদের নিয়ে ADSR অফিসে উপস্থিত হওয়া।
- বায়োমেট্রিক (আঙুলের ছাপ), ছবি এবং স্বাক্ষর প্রদান।
- দলিল রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হলে অনলাইনে IGR রসিদ সংগ্রহ।
প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস চেকলিস্ট (Checklist)
- মূল দলিল (Deed) প্রিন্ট করা অবস্থায়।
- ক্রেতা ও বিক্রেতার পরিচয়পত্র (আধার কার্ড / ভোটার কার্ড)।
- প্যান কার্ড (PAN Card): যদি প্রপার্টির স্ট্যাম্প ডিউটি ৫ লক্ষ টাকার বেশি হয়, তবে প্যান কার্ড বা ফর্ম ৬০/৬১ দেওয়া বাধ্যতামূলক।
- GRIPS পেমেন্টের ই-চালান বা রসিদ।
- জমির পর্চা (RoR) ও পূর্ববর্তী দলিলের কপি (Chain Deed)।
- দুজন উপযুক্ত সাক্ষীর পরিচয়পত্র।
৮. সাধারণ ভুল এবং আইনি সতর্কতা (Mistakes & Warnings)
- ভুল ১: সম্পত্তির মূল্য কম দেখানো (Under-Valuation): স্ট্যাম্প ডিউটি বাঁচানোর জন্য অনেকেই চুক্তিমূল্য কম দেখান। সাব-রেজিস্ট্রার যদি বুঝতে পারেন যে বাজার মূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে প্রপার্টি রেজিস্ট্রি হচ্ছে, তবে রুলস ২০০১ অনুযায়ী তিনি দলিলটি আটকে (Keep in abeyance) নোটিশ পাঠাতে পারেন।
- ভুল ২: বায়নানামা রেজিস্ট্রি না করা: অনেকেই শুধু নোটারিতে বায়নানামা বা অ্যাগ্রিমেন্ট করেন। কিন্তু ফ্ল্যাট বা জমির বায়নানামা সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে রেজিস্ট্রি না করলে আইনিভাবে তার কোনো জোর থাকে না।
- ভুল ৩: মিউটেশন না করা: রেজিস্ট্রেশন হয়ে গেলেই কাজ শেষ নয়। এর পরেই BL&LRO অফিস বা মিউনিসিপ্যালিটিতে গিয়ে নিজের নামে সম্পত্তি রেকর্ড বা মিউটেশন (Mutation) করা বাধ্যতামূলক।
৯. রেজিস্ট্রেশনের আগে ও পরে আপনার করণীয়
- পূর্ববর্তী সমস্ত দলিলের (Chain Deeds) কপি সংগ্রহ করে কোনো আইনজীবীকে দিয়ে টাইটেল সার্চ (Title Search) করিয়ে নিন।
- ই-পেমেন্ট করার পর রসিদটি যত্ন করে রাখুন।
- অনলাইনে সার্টিফায়েড কপি ডাউনলোড করে নিজের কাছে রাখুন।
- দলিলে কোনো তথ্যগত ভুল ধরা পড়লে, যত দ্রুত সম্ভব Rectification Deed-এর মাধ্যমে তা সংশোধনের উদ্যোগ নিন।
- অবিলম্বে BL&LRO অফিসে গিয়ে অথবা অনলাইনে জমির রেকর্ড বা মিউটেশনের জন্য আবেদন করুন।
১০. সাধারণ মানুষের জিজ্ঞাসা (FAQs)
প্রশ্ন ১: পশ্চিমবঙ্গে স্ট্যাম্প ডিউটি রেট কে নির্ধারণ করে?
উত্তর: পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অর্থ দপ্তর (Finance Department) এবং Directorate of Registration & Stamp Revenue স্ট্যাম্প ডিউটির রেট নির্ধারণ করে।
প্রশ্ন ২: স্ট্যাম্প ডিউটিতে ২% ছাড় কি এখনও আছে?
উত্তর: না। ১লা জুলাই ২০২৪ থেকে এই ছাড় বাতিল করা হয়েছে।
প্রশ্ন ৩: মার্কেট ভ্যালুর চেয়ে কম দামে প্রপার্টি কিনলে কি স্ট্যাম্প ডিউটি কম লাগবে?
উত্তর: না। মার্কেট ভ্যালু এবং চুক্তিমূল্য—এই দুটোর মধ্যে যেটি বেশি, তার ওপরই স্ট্যাম্প ডিউটি দিতে হবে।
প্রশ্ন ৪: মহিলাদের নামে প্রপার্টি কিনলে কি স্ট্যাম্প ডিউটিতে বিশেষ ছাড় আছে?
উত্তর: অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে মহিলাদের জন্য স্ট্যাম্প ডিউটি হ্রাসের কোনো বিশেষ নিয়ম উল্লেখ নেই (Official website does not mention this)।
প্রশ্ন ৫: ফ্ল্যাট এবং জমির ক্ষেত্রে কি রেট আলাদা হয়?
উত্তর: সাধারণত ফ্ল্যাট এবং জমির ক্ষেত্রে Conveyance রেট একই থাকে, তবে মার্কেট ভ্যালু নির্ধারণের পদ্ধতি আলাদা হয় (যেমন ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে ফ্লোর, লিফট ইত্যাদির ওপর ভ্যালু নির্ভর করে)।
প্রশ্ন ৬: রেজিস্ট্রেশন ফি কত?
উত্তর: যেকোনো সম্পত্তির রেজিস্ট্রেশন ফি তার মার্কেট ভ্যালুর ১%।
প্রশ্ন ৭: ই-পেমেন্ট কখন বাধ্যতামুলক?
উত্তর: স্ট্যাম্প ডিউটি ১০,০০০ টাকার বেশি বা রেজিস্ট্রেশন ফি ৫,০০০ টাকার বেশি হলে।
প্রশ্ন ৮: গিফ্ট ডিডে কি স্ট্যাম্প ডিউটি লাগে?
উত্তর: হ্যাঁ। তবে পরিবারের সদস্যদের (রক্তের সম্পর্ক) মধ্যে হলে বিশেষ ছাড় পাওয়া যায় (সাধারণত ০.৫%)।
প্রশ্ন ৯: আন্ডার-কনস্ট্রাকশন ফ্ল্যাটের অ্যাগ্রিমেন্টে কত স্ট্যাম্প ডিউটি লাগে?
উত্তর: মার্কেট ভ্যালুর ২% স্ট্যাম্প ডিউটি লাগে।
প্রশ্ন ১০: স্ট্যাম্প ডিউটির টাকা কি অফলাইনে দেওয়া যায়?
উত্তর: নির্দিষ্ট লিমিটের নিচে হলে দেওয়া যায়, তবে লিমিট পেরোলে GRIPS-এর মাধ্যমে ই-পেমেন্ট বাধ্যতামূলক।
প্রশ্ন ১১: প্রপার্টির ভ্যালুয়েশনে কি প্যান কার্ড বাধ্যতামূলক?
উত্তর: হ্যাঁ, যদি প্রদেয় স্ট্যাম্প ডিউটির পরিমাণ ৫ লক্ষ টাকার বেশি হয়, তবে বিক্রেতার প্যান কার্ড বা ফর্ম ১৬ দিতে হবে।
প্রশ্ন ১২: দলিলের সার্টিফায়েড কপি (Certified Copy) কীভাবে পাব?
উত্তর: পশ্চিমবঙ্গ e-District পোর্টাল বা wbregistration পোর্টাল থেকে অনলাইনে আবেদন করে পাওয়া যায়।
প্রশ্ন ১৩: রেজিস্ট্রেশনের দিন কি বিক্রেতাকে উপস্থিত থাকতে হবে?
উত্তর: হ্যাঁ, দলিল এক্সিকিউট করার জন্য বিক্রেতা এবং ক্রেতা দুজনকেই উপস্থিত থাকতে হবে (অথবা রেজিস্টার্ড পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি হোল্ডার)।
প্রশ্ন ১৪: ৪০ লক্ষ টাকার ওপর প্রপার্টির ক্ষেত্রে কি কোনো ছাড় আছে?
উত্তর: হ্যাঁ, ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮-এর বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ৪০ লক্ষ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত প্রপার্টীর ওপর ১% স্ট্যাম্প ডিউটি কমানো হয়েছিল, যা এখনও কার্যকর।
প্রশ্ন ১৫: মিউটেশন আর রেজিস্ট্রেশন কি একই?
উত্তর: না। রেজিস্ট্রেশন মানে মালিকানা হস্তান্তর, আর মিউটেশন মানে সরকারি ভূমি রেকর্ডে (পর্চা) আপনার নাম নথিভুক্ত হওয়া।
প্রশ্ন ১৬: লিগ্যাসি ডিড (Legacy Deed) কী?
উত্তর: পুরোনো দলিল যেগুলো কম্পিউটারে এন্ট্রি হওয়ার আগে হাতে লেখা হতো। পোর্টালে এখন এর ইনডেক্স সার্চ করা যায়।
প্রশ্ন ১৭: অনলাইনে ডিড সার্চ করব কীভাবে?
উত্তর: wbregistration.gov.in পোর্টালে গিয়ে 'Searching Deed' অপশনে প্রপার্টি বা নামের বিবরণ দিয়ে সার্চ করতে পারেন।
প্রশ্ন ১৮: দলিলে কি ব্যক্তিগত তথ্য গোপন (Mask) করা থাকে?
উত্তর: হ্যাঁ, সাম্প্রতিক নির্দেশিকা অনুযায়ী, দলিলে সংবেদনশীল সরকারি পরিচয়পত্র বা প্যানের মতো ব্যক্তিগত তথ্য মাস্ক (Masking) করে রাখা হয় ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার জন্য।
প্রশ্ন ১৯: রেজিস্ট্রেশন অফিস কি শনি ও রবিবার খোলা থাকে?
উত্তর: না, সাধারণত সরকারি ছুটির দিনগুলোতে অফিস বন্ধ থাকে।
প্রশ্ন০২ : স্ট্যাম্প ডিউটি রিফান্ড (Refund) কি পাওয়া সম্ভব?
উত্তর: হ্যাঁ, পাওয়া যায়। যদি টাকা জমা দেওয়ার পর কোনো কারণে দলিল রেজিস্ট্রেশন না করা হয় বা ভুলবশত অতিরিক্ত টাকা কেটে নেওয়া হয়, তবে রিফান্ড পাওয়া সম্ভব। তবে টাকা জমা দেওয়ার বা স্ট্যাম্প পেপার কেনার তারিখ থেকে সাধারণত ৬ মাসের মধ্যে রিফান্ডের জন্য আবেদন করতে হবে। তারপর সরকারি যাচাইকরণ শেষে টাকা সরাসরি আবেদনকারীর নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্টে (EFT-এর মাধ্যমে) ক্রেডিট করে দেওয়া হয়।
উপসংহার
অফিসিয়াল তথ্যসূত্র (Official References):
- Directorate of Registration & Stamp Revenue, Govt. of West Bengal (wbregistration.gov.in)
- West Bengal Stamp (Prevention of Under-Valuation of Instruments) Rules, 2001
- The Indian Stamp Act, 1899 & The Registration Act, 1908
- Finance Department Notification No. 997-F.T., dated 26.06.2024
- Official FAQs and User Manuals from e-Nathikaran system.














