দাগ নম্বর দিয়ে জমির মালিকের নাম জানার সহজ উপায় পশ্চিমবঙ্গ (২০২৬)

এই কাজটা করতে সাধারণত লাগে জমির জেলা, ব্লক, মৌজা, J.L. নম্বর আর দাগ নম্বর। নিচে মোবাইল বা কম্পিউটার থেকে কীভাবে সহজে জমির তথ্য খুঁজে বের করবেন, ধাপে ধাপে দেখানো হলো।
দাগ নম্বর দিয়ে কি জমির মালিকের নাম জানা যায়?
হ্যাঁ, জমির রেকর্ডে থাকা তথ্য অনুযায়ী দাগ নম্বর দিয়ে জমির মালিকের নাম জানা যায়।
তবে শুধু দাগ নম্বর জানলেই চলবে না। কারণ একই দাগ নম্বর বিভিন্ন মৌজায় থাকতে পারে। তাই ঠিক জমিটা খুঁজে পেতে হলে সাধারণত জেলা, ব্লক আর মৌজা জানা থাকতে হবে।
Banglarbhumi পোর্টালের Search by Plot অপশন ব্যবহার করে দাগ নম্বর দিয়ে রেকর্ড খোঁজা যায়।
দাগ নম্বর (Plot Number) কী?
দাগ নম্বর বা Plot Number হলো জমির একটা নির্দিষ্ট অংশকে আলাদা করে চেনার জন্য ব্যবহৃত একটা নম্বর।
সহজ কথায়, একটা মৌজার মধ্যে কোন জমিটা ঠিক কোথায় আছে, সেটা সরকারি ভূমি রেকর্ডে চিহ্নিত করার জন্যই এই দাগ নম্বর ব্যবহার হয়।
যেমন ধরুন, কোনো জমির দাগ নম্বর যদি ২৫০ হয়, তাহলে সেই মৌজার রেকর্ডে ২৫০ নম্বর দাগটা একটা নির্দিষ্ট জমিকেই বোঝাবে।
দাগ নম্বর আর খতিয়ান নম্বর কি একই?
না, দুটো এক জিনিস না। এদের কাজ আলাদা। দাগ নম্বর মূলত বোঝায় জমির নির্দিষ্ট একটা প্লট বা অংশকে। আর খতিয়ান হলো কোনো একজন ব্যক্তি বা একাধিক স্বত্বাধিকারীর নামে থাকা জমির রেকর্ডের অংশ।
সহজে মনে রাখতে হলে:- দাগ নম্বর = কোন জমি
- খতিয়ান নম্বর = কার নামে রেকর্ড, আর সেই খতিয়ানে কী কী জমির বিবরণ আছে
একটা খতিয়ানের আওতায় একাধিক দাগ নম্বর থাকতে পারে। আবার একটা দাগের সাথেও একাধিক খতিয়ান বা মালিকের নাম থাকতে পারে।
দাগ নম্বর দিয়ে জমির মালিকের নাম জানতে কী কী লাগবে?
দাগ নম্বর দিয়ে জমির মালিকের নাম জানতে হলে আগে থেকে হাতের কাছে এই তথ্যগুলো রাখুন:
- সঠিক জেলা (District): জমিটি ঠিক কোন জেলার অধীনে পড়ছে, সেটা।
- সঠিক ব্লক (Block): সংশ্লিষ্ট ব্লক বা থানার নাম।
- মৌজার নাম ও জে.এল নম্বর (Mouza & J.L. No.): জমিটি কোন মৌজার অন্তর্ভুক্ত, তার নাম আর সেই মৌজার জুরিসডিকশন লিস্ট (J.L.) নম্বর।
- দাগ নম্বর (Plot Number): যে জমিটার মালিকানা আপনি যাচাই করতে চাইছেন, তার নম্বর।
- একটি সক্রিয় অ্যাকাউন্ট: বাংলারভূমি মাধ্যমে তথ্য দেখতে এই পোর্টালে একটি অ্যাকাউন্ট থাকা দরকার।
দাগ নম্বর দিয়ে জমির মালিকের নাম জানবেন কীভাবে?
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভূমি দপ্তরের পোর্টাল থেকে কীভাবে তথ্য বের করবেন, তার পুরো অফিসিয়াল প্রসেসটা নিচে বিস্তারিত ভাবে দেখানো হলো:
ধাপ ১: বাংলারভূমি পোর্টালে ঢোকা ও লগইন করা
![]() |
| Source - banglarbhumi.gov.in |
যদি বাংলারভূমি পোর্টালে আপনার আগে থেকে কোনো অ্যাকাউন্ট না থাকে, তাহলে চিন্তার কিছু নেই 'Sign Up' বাটনে ক্লিক করে Citizen Registration ফর্মটা পূরণ করলেই একদম ফ্রিতে অ্যাকাউন্ট বানিয়ে নিতে পারবেন। বিস্তারিত জানতে পড়ে নিতে পারেন আমাদের এই গাইডটি: বাংলারভূমি অ্যাকাউন্ট তৈরির গাইড।
ধাপ ২: 'Know Your Property' মেনু বেছে নেওয়া
![]() |
| Source - banglarbhumi.gov.in |
ধাপ ৩: "Khatian & Plot Information" ফর্ম পূরণ
মৌজা শনাক্তকরণ (Mouza Identification)
![]() |
| Source - banglarbhumi.gov.in |
'Search by Plot' অপশন ও ক্যাপচা পূরণ
![]() |
| Source - banglarbhumi.gov.in |
'View' বাটনে ক্লিক করা ও ফলাফল যাচাই
![]() |
| Source - banglarbhumi.gov.in |
মালিকের নাম সরাসরি না দেখালে কী করবেন?
অনেক সময় বাংলারভূমি পোর্টালে কারিগরি ত্রুটি বা ডেটা আপডেটের কারণে 'Search by Plot' করলে সরাসরি মালিকের নাম দেখায় না, শুধু খতিয়ান নম্বরের একটা তালিকা দেখায়। এমন হলে করণীয়:
| ধাপ | কাজ | বিবরণ |
|---|---|---|
| ১ | খতিয়ান নম্বর নোট করুন | দাগ নম্বর সার্চ করার পর যে টেবিল আসবে, সেখান থেকে সংশ্লিষ্ট খতিয়ান নম্বরটা কোথাও লিখে রাখুন। |
| ২ | 'Search by Khatian' নির্বাচন করুন | উপরের অপশন থেকে 'Search by Plot'-এর বদলে 'Search by Khatian' বেছে নিন। |
| ৩ | খতিয়ান নম্বর দিয়ে সার্চ করুন | নির্দিষ্ট বক্সে খতিয়ান নম্বরটা লিখে ক্যাপচা কোড দিয়ে আবার 'View' বাটনে ক্লিক করুন। এতে মালিকের নাম ও সম্পূর্ণ বিবরণ চলে আসবে। |
সাধারণ সমস্যা ও সমাধান
| সমস্যা | কারণ | সমাধান |
|---|---|---|
| 'No Record Found' বা 'Invalid Captcha' দেখালে | মৌজা, জে.এল নম্বর বা দাগ নম্বর ভুল দিলে, অথবা ক্যাপচা কোড টাইপ করতে ভুল হলে এই মেসেজ আসে। কখনো কখনো ভূমি সংস্কার দপ্তরে ওই দাগের নতুন রেকর্ড আপলোড না হলেও এমনটা দেখাতে পারে। | সব স্পেলিং আর নম্বর আবার ভালো করে চেক করুন। ক্যাপচা কোডটা রিফ্রেশ করে নতুন করে টাইপ করুন। তারপরও সমস্যা না মিটলে সংশ্লিষ্ট গাইড দেখতে পারেন। |
| সাইট ধীরগতিতে কাজ করলে বা 'Session Expired' দেখালে | অফিসিয়াল পোর্টালে একসাথে অনেক বেশি মানুষ ব্রাউজ করলে সার্ভারের ওপর চাপ পড়ে যায়। | ব্রাউজারের ক্যাশ (Cache) ক্লিয়ার করে আবার লগইন করুন, অথবা অফিস টাইমের বাইরে (যেমন ভোরে বা রাতে) চেষ্টা করে দেখুন। |
জমি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা ও পরামর্শ
কী করবেন?
- জমির দাগ নম্বর টাইপ করার সময় বাটা দাগ থাকলে নম্বর দুটি সঠিকভাবে দুটি বক্সে বসান।
- মৌজা সিলেক্ট করার সময় নামের পাশাপাশি J.L. নম্বরটি অবশ্যই মিলিয়ে নেবেন, কারণ একই নামে একটি ব্লকে একাধিক মৌজা থাকতে পারে।
কী করবেন না?
- লগইন করার জন্য কোনো থার্ড-পার্টি অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে আপনার Banglarbhumi আইডি ও পাসওয়ার্ড শেয়ার করবেন না।
- মিউটেশন না হওয়া অনলাইন রেকর্ডের ওপর ভিত্তি করে জমি ক্রয়ের জন্য কোনো আর্থিক লেনদেন করবেন না।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
দাগ নম্বর দিয়ে জমির মালিকের নাম দেখতে কি কোনো ফি বা টাকা দিতে হয়?
উত্তর: না, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের Banglarbhumi পোর্টালে লগইন করে 'Know Your Property' অপশনের মাধ্যমে যেকোনো জমির দাগ নম্বর দিয়ে মালিকের নাম আর প্লটের তথ্য একদম বিনামূল্যে দেখা যায়।
বাংলারভূমি পোর্টালে জমির তথ্য দেখতে কি অ্যাকাউন্ট খোলা বাধ্যতামূলক?
উত্তর: হ্যাঁ, বর্তমানে পোর্টালে জমির খতিয়ান বা দাগের তথ্য অনুসন্ধান করতে হলে নিজের ইউজার আইডি (মোবাইল নম্বর) আর পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করা লাগে। তবে মৌজা ম্যাপের মতো কিছু সাধারণ তথ্য লগইন ছাড়াও দেখা যায়।
দাগ নম্বর জানা আছে কিন্তু মৌজা বা জে.এল নম্বর না জানলে কি নাম বের করা যাবে?
উত্তর: সাধারণত না, অনলাইনে সঠিক তথ্য পেতে হলে নির্দিষ্ট জেলা, ব্লক আর মৌজা (JL. No) জানা থাকা দরকার। কারণ একই দাগ নম্বর বিভিন্ন মৌজায় থাকতে পারে, তাই মৌজা ছাড়া সঠিক মালিক খুঁজে বের করা সম্ভব না।
দাগ নম্বর ইনপুট করার পর 'No Record Found' দেখানোর কারণ কী?
উত্তর: এর প্রধান কারণ হতে পারে ভুল জেলা, ব্লক বা মৌজা সিলেক্ট করা, দাগ নম্বর ভুল টাইপ করা, অথবা জমিটার রেকর্ড এখনো ডিজিটাল ডেটাবেসে বা অনলাইন পোর্টালে যুক্ত না হওয়া।
বাটা দাগ নম্বর (যেমন 120/5) অনলাইনে কীভাবে লিখতে হয়?
উত্তর: বাটা দাগ থাকলে দুটো আলাদা বক্সে লিখতে হয় - প্রথম বক্সে মূল দাগ নম্বর, যেমন 120, আর দ্বিতীয় বক্সে বাটা নম্বর, যেমন 5। এভাবে ইংরেজি সংখ্যায় দুটো বক্সে আলাদা করে টাইপ করলেই বাটা দাগের তথ্য চলে আসবে।
অনলাইন থেকে প্রাপ্ত জমির তথ্যের প্রিন্টআউট কি আদালতে প্রমাণ হিসেবে গ্রাহ্য?
উত্তর: না, অনলাইনের এই সাধারণ তথ্য শুধু প্রাথমিক ধারণা বা অনুসন্ধানের জন্যই ব্যবহার করা যায়। যেকোনো আইনি বা আদালতের কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট BL&LRO অফিস থেকে বা অনলাইন পোর্টালে ফি দিয়ে 'সার্টিফায়েড পর্চা' (Certified Copy) সংগ্রহ করে নিতে হবে।
খতিয়ান নম্বর দিয়ে সার্চ করলে কি ওই মালিকের সব জমির দাগ নম্বর দেখা যায়?
উত্তর: হ্যাঁ, পোর্টালে 'Search by Khatian' অপশন ব্যবহার করলে সেই খতিয়ানের অধীনে ওই মৌজায় ওই ব্যক্তির নামে মোট কতটা জমি আছে আর সেগুলো কোন কোন দাগ বা প্লটের অংশ, তার পুরো তালিকা দেখা যাবে।
একই দাগ নম্বরে কি একাধিক ব্যক্তির নাম থাকতে পারে?
উত্তর: হ্যাঁ, যদি জমিটা যৌথ মালিকানার (Joint Property) বা অংশীদারি সম্পত্তি হয়, তাহলে একটা নির্দিষ্ট দাগ বা প্লট নম্বরের অধীনে একাধিক আলাদা খতিয়ান, মালিকের নাম ও জমির অংশের পরিমাণ দেখাবে।
বাংলারভূমি ওয়েবসাইটে লগইন করার সময় ওটিপি (OTP) না আসলে কী করব?
উত্তর: প্রথমে আপনার মোবাইলের নেটওয়ার্ক কানেকশনটা চেক করে নিন। তাতেও কাজ না হলে ব্রাউজার ট্যাবটা বন্ধ করে কিছুক্ষণ পর আবার চেষ্টা করুন। সাধারণত সরকারি সার্ভারে অতিরিক্ত চাপ থাকলে ওটিপি আসতে একটু দেরি হতে পারে।
দাগ নম্বর দিয়ে সার্চ করার পর যদি মালিকের নাম ভুল দেখায় তবে কী করব?
উত্তর: আপনার রেজিস্টার করা দলিলের সাথে যদি অনলাইন রেকর্ডের নামে কোনো অমিল বা বানান ভুল থাকে, তাহলে সেই রেকর্ড ঠিক করার জন্য সব বৈধ মূল দলিলপত্র আর পর্চা নিয়ে সংশ্লিষ্ট BL&LRO অফিসে যোগাযোগ করতে হবে, বা Rectification Deed এর জন্য আবেদন করতে হবে।
বাংলারভূমি পোর্টালটি সাধারণত কোন সময়ে সবচেয়ে দ্রুত ও ভালো কাজ করে?
উত্তর: সাধারণ সরকারি অফিস সময়ের বাইরে, যেমন সকাল ৮টার আগে অথবা সন্ধ্যা ৭টার পর, এই পোর্টালের সার্ভার তুলনামূলক ফাঁকা থাকে। তাই এই সময়ে ঢুকলে জমির তথ্য অনেক দ্রুত ও ঝামেলাহীনভাবে দেখা যায়।
উপসংহার
পশ্চিমবঙ্গের ভূমি সংস্কার দপ্তর এখন বাংলারভূমি পোর্টালের মাধ্যমে দাগ নম্বর দিয়ে জমির মালিকের নাম জানার পুরো প্রক্রিয়াটাকে অনেক সহজ আর স্বচ্ছ করে তুলেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ আর দালালের খপ্পরে না পড়ে নিজেরাই জমির প্রাথমিক সত্যতা যাচাই করে নিতে পারছেন।
তবে মনে রাখা দরকার - অনলাইন ডাটাবেসটা নিয়মিত আপডেট হলেও, চূড়ান্ত আইনি সুরক্ষার জন্য সবসময় সরকারি সার্টিফায়েড পর্চা আর মূল দলিলের ওপরই ভরসা করাই ভালো।
অনলাইনে পাওয়া তথ্যকে শুধু প্রাথমিক যাচাইয়ের জন্যই ব্যবহার করা উচিত। জমি কেনাবেচা বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি ও ভূমি দপ্তরের রেকর্ড অবশ্যই যাচাই করে নেবেন। আশা করি এই গাইডটা আপনার কাজে লাগবে। আর কোনো প্রশ্ন থাকলে কমেন্টে জানাতে পারেন।
তথ্যসূত্র: পশ্চিমবঙ্গের ভূমি সংস্কার দপ্তরের অফিসিয়াল পোর্টাল Banglarbhumi.
জমি-জমা, ভূমি রেকর্ড, সরকারি প্রকল্প ও নাগরিক পরিষেবা নিয়ে তথ্যভিত্তিক কনটেন্ট তৈরি করি। সরকারি ও নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তথ্য যাচাই করে সহজ ভাষায় তুলে ধরাই আমার লক্ষ্য, যাতে সাধারণ মানুষ বিভিন্ন সরকারি পরিষেবা ও আবেদন প্রক্রিয়া সহজে বুঝতে পারেন।




