জমির দাগ নম্বর ভুল হলে করণীয় কী? পশ্চিমবঙ্গে দলিল সংশোধনের সম্পূর্ণ গাইড ২০২৬
জমির দলিলে দাগ নম্বর (Plot Number) ভুল থাকলে ভবিষ্যতে মিউটেশন, ব্যাংক লোন, জমি বিক্রি কিংবা মালিকানা প্রমাণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন। অনেক সময় দলিলে শুধুমাত্র একটি সংখ্যার ভুলের কারণেই প্রকৃত মালিক হয়েও সরকারি রেকর্ডে নানা জটিলতা দেখা দেয়।
পশ্চিমবঙ্গে দাগ নম্বর হলো কোনো নির্দিষ্ট জমির সরকারি পরিচয় নম্বর। তাই দলিলে উল্লেখিত দাগ নম্বর এবং খতিয়ান বা ভূমি রেকর্ডে থাকা দাগ নম্বরের মধ্যে অমিল থাকলে বিষয়টি দ্রুত যাচাই করে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা উচিত।
এই নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব দাগ নম্বর ভুল হওয়ার সাধারণ কারণ, এর ফলে কী কী সমস্যা হতে পারে, দলিল সংশোধনের আইনি উপায়, প্রয়োজনীয় নথিপত্র, সম্ভাব্য খরচ, সময়সীমা এবং পশ্চিমবঙ্গে ২০২৬ সালের বর্তমান নিয়ম সম্পর্কে।
দলিলে দাগ নম্বর ভুল থাকলে সাধারণত Rectification Deed (সংশোধন দলিল) রেজিস্ট্রি করে ভুল সংশোধন করা যায়। বিক্রেতা ও ক্রেতা উভয় পক্ষ সম্মত থাকলে প্রক্রিয়াটি তুলনামূলক সহজ হয়। তবে কোনো পক্ষ রাজি না থাকলে বা অন্য জটিলতা থাকলে আদালতের সহায়তা নিতে হতে পারে।
জমির দলিলে দাগ নম্বর ভুল হওয়ার প্রধান কারণসমূহ।
অনেকেই মনে করেন দলিল একবার রেজিস্ট্রি হয়ে গেলে সেখানে ভুল থাকার সম্ভাবনা খুব কম। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, জমি সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে দাগ নম্বর ভুল হওয়া একটি সাধারণ ঘটনা। বিশেষ করে পুরনো দলিল, হাতে লেখা নথি বা তথ্য যাচাই না করে দলিল তৈরির কারণে এই ধরনের ভুল দেখা দিতে পারে।
নিচে দাগ নম্বর ভুল হওয়ার কয়েকটি সাধারণ কারণ উল্লেখ করা হলো:
১. টাইপিং বা লেখার ভুল
দলিল তৈরির সময় অসাবধানতাবশত একটি সংখ্যার পরিবর্তে অন্য সংখ্যা লেখা হয়ে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, প্রকৃত দাগ নম্বর যদি ২৪৫ হয়, তাহলে ভুলবশত ২৫৪ লেখা হতে পারে। ছোট এই ভুলটি পরবর্তীতে মিউটেশন বা জমি বিক্রির সময় বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
২. পুরনো দলিলের তথ্য হুবহু ব্যবহার করা
অনেক ক্ষেত্রে নতুন দলিল তৈরির সময় আগের পিঠ দলিল বা মাদার ডিড দেখে তথ্য কপি করা হয়। যদি পুরনো দলিলেই কোনো ভুল থেকে থাকে, তাহলে সেই ভুল নতুন দলিলেও চলে আসে। ফলে একই ভুল বছরের পর বছর ধরে থেকেই যায়।
৩. এলআর (LR) ও আরএস (RS) দাগ নম্বর নিয়ে বিভ্রান্তি
পশ্চিমবঙ্গে অনেক জমির ক্ষেত্রে এলআর (LR) এবং আরএস (RS) উভয় ধরনের দাগ নম্বর থাকে। অনেক সময় দলিল তৈরির সময় ভুল করে আরএস দাগের জায়গায় এলআর দাগ নম্বর অথবা এলআর-এর জায়গায় আরএস নম্বর লিখে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে খতিয়ান বা রেকর্ড যাচাই করার সময় এই ভুল ধরা পড়ে।
৪. জমির রেকর্ড যাচাই না করে দলিল রেজিস্ট্রি করা
অনেক ক্রেতা দলিল রেজিস্ট্রির আগে খতিয়ান, পর্চা বা প্লট তথ্য ভালোভাবে মিলিয়ে দেখেন না। ফলে ভুল দাগ নম্বর থাকা সত্ত্বেও দলিল রেজিস্ট্রি হয়ে যায় এবং সমস্যাটা পরে ধরা পড়ে।
দাগ নম্বর ভুল থাকলে কী কী সমস্যা হতে পারে?
অনেকেই মনে করেন দলিল রেজিস্ট্রি হয়ে গেলেই সমস্ত কাজ শেষ। কিন্তু বাস্তবে দলিলে দাগ নম্বর ভুল থাকলে ভবিষ্যতে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে বছরের পর বছর সমস্যা ধরা না পড়লেও জমি বিক্রি, মিউটেশন বা ব্যাংক ঋণের সময় হঠাৎ করে এই ভুল সামনে আসে।
১. মিউটেশন বা নামজারির সমস্যা
জমি কেনার পর সাধারণত পরবর্তী ধাপ হলো মিউটেশন বা নামজারি করা। কিন্তু দলিলে উল্লেখিত দাগ নম্বর এবং সরকারি খতিয়ানের দাগ নম্বরের মধ্যে অমিল থাকলে সংশ্লিষ্ট দপ্তর আবেদন যাচাইয়ের সময় আপত্তি তুলতে পারে। ফলে মিউটেশন প্রক্রিয়া বিলম্বিত বা বাতিল হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
২. জমি বিক্রি বা হস্তান্তরে বাধা
ভবিষ্যতে জমি বিক্রির সময় ক্রেতা বা তার আইনজীবী জমির নথিপত্র যাচাই করেন। তখন দাগ নম্বরের ভুল ধরা পড়লে ক্রেতা জমি কিনতে অনাগ্রহী হতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে ভুল সংশোধন না করা পর্যন্ত রেজিস্ট্রেশনের প্রক্রিয়াও আটকে যেতে পারে।
৩. ব্যাংক ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা
বর্তমানে জমি বা বাড়ির বিপরীতে ঋণ নেওয়ার আগে ব্যাংক জমির সমস্ত নথি যাচাই করে। দলিলে থাকা দাগ নম্বর এবং সরকারি রেকর্ডের তথ্য না মিললে ব্যাংক অতিরিক্ত ব্যাখ্যা বা সংশোধিত নথি চাইতে পারে। ফলে ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়া দীর্ঘ হতে পারে বা আবেদন বাতিলও হতে পারে।
৪. ভবিষ্যতে আইনি বিরোধের ঝুঁকি
দাগ নম্বর ভুল থাকলে জমির প্রকৃত অবস্থান ও মালিকানা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে শরিকি সম্পত্তি বা একাধিক মালিকের জমির ক্ষেত্রে এই ধরনের ভুল ভবিষ্যতে আইনি বিরোধের কারণ হতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ দাগ নম্বর ভুল হলে কী সমস্যা হতে পারে?
ধরুন, আপনি ২০২০ সালে একটি জমি কিনেছেন। জমির প্রকৃত এল.আর (LR) দাগ নম্বর ৪১২ হলেও দলিল তৈরির সময় ভুলবশত ৪২১ লেখা হয়েছে। তখন হয়তো বিষয়টি আপনার নজরে আসেনি এবং দলিল রেজিস্ট্রির পর আর যাচাই করেননি।
কয়েক বছর পরে যখন মিউটেশন, ব্যাংক ঋণ অথবা জমি বিক্রির জন্য নথিপত্র যাচাই করা হয়, তখন দেখা গেল দলিলে উল্লেখিত ৪২১ নম্বর দাগটি আসলে অন্য একটি জমির। ফলে সরকারি রেকর্ড এবং দলিলের তথ্যের মধ্যে অমিল তৈরি হয়।
এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তর অতিরিক্ত নথিপত্র চাইতে পারে, মিউটেশন প্রক্রিয়া দেরি হতে পারে অথবা ব্যাংক ঋণের আবেদন সাময়িকভাবে বন্ধ হতে পারে। তাই দলিল হাতে পাওয়ার পর দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর এবং জমির চারদিকের সীমানা ঠিক আছে কিনা তা ভালোভাবে যাচাই করা উচিত।
দাগ নম্বর ভুল হলে আইনি সমাধান কী?
দলিলে দাগ নম্বর ভুল থাকলে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী এই ধরনের ভুল সংশোধনের সুযোগ রয়েছে। তবে কোন পদ্ধতিতে সংশোধন হবে, তা নির্ভর করে আপনার পরিস্থিতির ওপর।
| পরিস্থিতি | সম্ভাব্য সমাধান |
|---|---|
| বিক্রেতা ও ক্রেতা উভয়েই জীবিত এবং সম্মত | Rectification Deed (সংশোধন দলিল) |
| বিক্রেতা মারা গেছেন | উত্তরাধিকারীদের অংশগ্রহণ প্রয়োজন হতে পারে |
| কোনো পক্ষ স্বাক্ষর করতে রাজি নয় | দেওয়ানি আদালতের সাহায্য নিতে হতে পারে |
| দাগ নম্বরের কারণে মিউটেশন আটকে গেছে | প্রথমে দলিল সংশোধন, তারপর মিউটেশন আবেদন |
| শুধুমাত্র ভূমি রেকর্ডে ভুল আছে | BL & LRO অফিসে আবেদন |
ক) সংশোধন দলিল বা Rectification Deed
যদি জমির বিক্রেতা এবং ক্রেতা উভয় পক্ষ জীবিত থাকেন এবং ভুলটি সংশোধন করতে সম্মত হন, তাহলে Rectification Deed বা সংশোধন দলিল রেজিস্ট্রি করা সবচেয়ে সহজ উপায়।
এই দলিলের মাধ্যমে মূল দলিলে থাকা ভুল তথ্য সংশোধন করে সঠিক তথ্য যুক্ত করা হয়। সংশোধন দলিল মূল দলিলের পরিপূরক নথি হিসেবে সংরক্ষিত থাকে এবং ভবিষ্যতে উভয় দলিল একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়।
সাধারণত দলিলে ভুল দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর, নামের বানান বা অন্যান্য টাইপিং জনিত ভুল সংশোধনের জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: Rectification Deed-এর মাধ্যমে জমির শ্রেণি, জমির পরিমাণ বা জমির চারদিকের সীমানার মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বড় আকারে পরিবর্তন করা যায় না। এটি মূলত টাইপিং ভুল সংশোধনের জন্য ব্যবহৃত হয়।
খ) দেওয়ানি আদালতের সাহায্য নেওয়া
সব ক্ষেত্রে সংশোধন দলিল করা সম্ভব হয় না। যেমন—
- বিক্রেতা মারা গেছেন।
- বিক্রেতার উত্তরাধিকারীরা সহযোগিতা করতে রাজি নন।
- কোনো পক্ষ সংশোধন দলিলে স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করছেন।
- মালিকানা নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে দেওয়ানি আদালতে যেতে হতে পারে। আদালত সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও প্রমাণ যাচাই করে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে পারেন। আদালতের আদেশ পাওয়ার পর সেই অনুযায়ী পরবর্তী প্রশাসনিক বা রেকর্ড সংশোধনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
তবে আদালতের মাধ্যমে সমাধান পেতে তুলনামূলক বেশি সময় এবং খরচ লাগতে পারে। তাই সম্ভব হলে প্রথমে সংশোধন দলিলের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করার চেষ্টা করাই ভালো।
সংশোধন দলিল (Rectification Deed) করার জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র
দাগ নম্বর বা অন্যান্য করণিক ভুল সংশোধনের জন্য সংশোধন দলিল (Rectification Deed) রেজিস্ট্রি করতে হলে সাধারণত নিচের নথিপত্রগুলো প্রয়োজন হয়। আবেদন করার আগে সমস্ত নথিপত্র একবার ভালোভাবে যাচাই করে নেওয়া উচিত।
| নথির নাম | কেন প্রয়োজন |
|---|---|
| মূল রেজিস্ট্রিকৃত দলিল (Original Deed) | যে দলিলের ভুল সংশোধন করা হবে তার তথ্য যাচাই করার জন্য। |
| পিঠ দলিল (Mother Deed) | জমির পূর্ববর্তী মালিকানা ও তথ্য যাচাই করার জন্য。 |
| আপডেটেড খতিয়ান ও পরচা | সঠিক দাগ নম্বর ও জমির তথ্য মিলিয়ে দেখার জন্য। |
| জমির ম্যাপ বা স্কেচ | প্রয়োজনে জমির অবস্থান ও সীমানা স্পষ্ট করার জন্য। |
| আধার কার্ড, প্যান কার্ড ও পাসপোর্ট সাইজ ছবি | দাতা ও গ্রহীতার পরিচয় যাচাইয়ের জন্য। |
| আপডেটেড ট্যাক্স রসিদ | জমির কর পরিশোধ সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করার জন্য। |
দ্রষ্টব্য: নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সাব-রেজিস্ট্রার অফিস অতিরিক্ত নথিপত্রও চাইতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট অফিসে বর্তমান নিয়ম জেনে নেওয়া ভালো।
পশ্চিমবঙ্গে সংশোধন দলিল (Rectification Deed) করার আবেদন প্রক্রিয়া
দলিলে দাগ নম্বর ভুল থাকলে এবং দলিল সংশোধন (Rectification Deed) করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর পরবর্তী ধাপ হলো রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের Registration & Stamp Revenue Department-এর অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে আবেদন প্রক্রিয়ার বেশিরভাগ কাজ শুরু করা যায়।ধাপ ১: দলিল সংশোধনের খসড়া প্রস্তুত করুন
প্রথমে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী বা দলিল লেখকের সাহায্যে দলিল সংশোধনের খসড়া (Draft) তৈরি করতে হবে। খসড়ায় মূল দলিলে কোন দাগ নম্বর ভুল রয়েছে এবং সঠিক দাগ নম্বর কী হবে, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।ধাপ ২: Registration Portal-এ আবেদন শুরু করুন
এরপর পশ্চিমবঙ্গ জমি রেজিস্ট্রেশন বিভাগের অনলাইন পোর্টালে গিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান করে অনলাইন আবেদন করতে হবে। আবেদন করার সময় মূল দলিলের তথ্য, সংশোধনের কারণ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের তথ্য সঠিকভাবে দিতে হবে।ধাপ ৩: নথিপত্র যাচাই ও ই-অ্যাসেসমেন্ট
আবেদন জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করা হয় এবং একটি Assessment Slip জেনারেট হবে। এই ধাপে জমা দেওয়া তথ্য ও নথিপত্রের ভিত্তিতে পরবর্তী প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়।ধাপ ৪: সরকারি ফি পরিশোধ করুন
নির্ধারিত স্ট্যাম্প ডিউটি, রেজিস্ট্রেশন ফি এবং অন্যান্য প্রযোজ্য সরকারি চার্জ অনলাইনে পরিশোধ করতে হবে। পেমেন্ট সম্পন্ন হলে রসিদটি সংরক্ষণ করে রাখুন।ধাপ ৫: সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে উপস্থিত হন
অনলাইন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর নির্ধারিত দিনে বিক্রেতা, ক্রেতা এবং প্রয়োজনীয় সাক্ষীদের নিয়ে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে যেতে হবে। সেখানে বায়োমেট্রিক যাচাই, নথিপত্র এবং প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়।ধাপ ৬: সংশোধন দলিল সংগ্রহ করুন
সবকিছু সঠিক থাকলে সংশোধন দলিল রেজিস্ট্রি করা হয়। পরবর্তীতে এই সংশোধন দলিল মূল দলিলের সঙ্গে সংরক্ষণ করতে হবে এবং জমি সংক্রান্ত যেকোনো কাজে উভয় নথি একসঙ্গে ব্যবহার করতে হবে।গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
সংশোধন দলিল রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হওয়ার পর মিউটেশন বা অন্যান্য সরকারি রেকর্ডে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন হয়েছে কিনা তা সংশ্লিষ্ট দপ্তরেই যাচাই করে নেওয়া ভালো। এতে ভবিষ্যতে জমি বিক্রি, ব্যাংক ঋণ বা মালিকানা প্রমাণের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা এড়ানো যায়।
সংশোধন দলিল করতে কত খরচ এবং কত সময় লাগে?
দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর বা অন্যান্য করণিক (Clerical) ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রে অধিকাংশ মানুষের প্রথম প্রশ্ন থাকে—সংশোধন দলিল করতে কত টাকা খরচ হবে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে কতদিন লাগবে? যদিও নির্দিষ্ট খরচ ও সময় পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে, তবুও সাধারণ ধারণা নিচে দেওয়া হলো।
সম্ভাব্য খরচ
যদি শুধুমাত্র টাইপিং ভুল, দাগ নম্বরের ভুল বা অনুরূপ করণিক ভুল সংশোধন করা হয় এবং জমির পরিমাণ, শ্রেণি বা বাজারমূল্যের কোনো পরিবর্তন না ঘটে, তাহলে সাধারণত খরচ তুলনামূলক কম হয়।
- স্ট্যাম্প ডিউটি (Stamp Duty): ভুলের ধরন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সরকারি ফি প্রযোজ্য হতে পারে।
- রেজিস্ট্রেশন ফি: সংশোধন দলিল রেজিস্ট্রির জন্য প্রযোজ্য সরকারি প্রসেসিং চার্জ।
- আইনজীবী বা দলিল লেখকের ফি: খসড়া প্রস্তুত ও অন্যান্য আইনি সহায়তার জন্য অতিরিক্ত খরচ হতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ: সরকারি ফি সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রার অফিস অথবা Registration Portal থেকে সর্বশেষ তথ্য যাচাই করে নেওয়া উচিত।
সংশোধন দলিল করতে কত সময় লাগে?
প্রয়োজনীয় নথিপত্র সঠিক থাকলে এবং উভয় পক্ষ সহযোগিতা করলে সাধারণত প্রক্রিয়াটি খুব বেশি সময়সাপেক্ষ হয় না।
| প্রক্রিয়া | সম্ভাব্য সময় |
|---|---|
| সংশোধন দলিল (উভয় পক্ষ সম্মত থাকলে) | প্রায় ৭–১৫ কার্যদিবস |
| আদালতের মাধ্যমে সমাধান | কয়েক মাস থেকে ২ বছর বা তার বেশি |
যদি বিক্রেতা ও ক্রেতা উভয়েই উপস্থিত থেকে সংশোধন দলিল রেজিস্ট্রি করতে রাজি থাকেন, তাহলে সাধারণত কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়। তবে বিষয়টি আদালতে গড়ালে মামলার জটিলতা, শুনানি এবং নথি যাচাইয়ের কারণে অনেক বেশি সময় লাগতে পারে।
উপসংহার
জমির দাগ নম্বর ভুল থাকলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ ভবিষ্যতে মিউটেশন, ব্যাংক ঋণ, জমি বিক্রি বা মালিকানা প্রমাণের ক্ষেত্রে নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে।
তাই দলিল হাতে পাওয়ার পর দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর এবং জমির অন্যান্য তথ্য ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি। যদি কোনো ভুল ধরা পড়ে, তাহলে দ্রুত সংশোধন দলিল (Rectification Deed) করার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। আর যদি আপনার দলিলে ডিজিটাল রেকর্ডে ভুল থাকলে তাহলে Legacy Deed Correction মাধ্যমে করতে পারেন।
সব মিলিয়ে, জমির দাগ নম্বর ভুল হলে করণীয় হলো সঠিক নথিপত্র যাচাই করে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন দলিল করা এবং প্রয়োজনে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী বা সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের পরামর্শ নেওয়া।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. বিক্রেতা যদি মারা যান, তবে কি সংশোধন দলিল করা সম্ভব?
হ্যাঁ, তবে প্রক্রিয়াটি জটিল হতে পারে। যদি মূল বিক্রেতা জীবিত না থাকেন, তাহলে তাঁর আইনগত উত্তরাধিকারীদের অংশগ্রহণ প্রয়োজন হতে পারে। কোনো বিরোধ বা জটিলতা থাকলে দেওয়ানি আদালতের সাহায্য নিতে হতে পারে।
২. সংশোধন দলিলের পরও কি বি.এল.আর.ও (BL&LRO) অফিসে যেতে হবে?
হ্যাঁ। সংশোধন দলিল রেজিস্ট্রি হওয়ার পর প্রয়োজন অনুযায়ী মিউটেশন বা রেকর্ড সংশোধনের জন্য BL&LRO অফিসে আবেদন করতে হতে পারে। কারণ রেজিস্ট্রিকৃত দলিল এবং ভূমি রেকর্ড দুটি পৃথক প্রশাসনিক ব্যবস্থা।
৩. শুধুমাত্র বি.এল.আর.ও অফিসে আবেদন করে কি দলিলের ভুল সংশোধন করা যায়?
না। BL & LRO অফিস ভূমি রেকর্ড ও মিউটেশন সংক্রান্ত কাজ করে। রেজিস্ট্রিকৃত দলিলে থাকা ভুল সংশোধনের ক্ষমতা রেজিস্ট্রেশন কর্তৃপক্ষের অধীনে। তাই দলিলে ভুল থাকলে সাধারণত সংশোধন দলিল (Rectification Deed) করতে হয়।
৪. রেজিস্ট্রি করা দলিলের দাগ নম্বর ভুল থাকলে কি সেই জমি বিক্রি করা যায়?
আইনগতভাবে ভুল দাগ নম্বর ভবিষ্যতে যাচাই, মিউটেশন, ব্যাংক ঋণ বা নতুন রেজিস্ট্রেশনের সময় সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই জমি বিক্রির আগে ভুলটি সংশোধন করে নেওয়াই নিরাপদ ও বাঞ্ছনীয়।
৫. সংশোধন দলিল করার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা মেয়াদ আছে কি?
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রেজিস্ট্রেশন পোর্টালে করণিক ভুল সংশোধনের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ নেই। তবে ভুল ধরা পড়ার পর যত দ্রুত সম্ভব সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে মিউটেশন, বিক্রয় বা মালিকানা সংক্রান্ত জটিলতা এড়ানো যায়।
