জমির বর্গা তোলার নিয়ম । How to cancel barga record in West Bengal

পশ্চিমবঙ্গে জমির বর্গা কাটানোর নিয়ম, বর্গাদার উচ্ছেদের আইন, BL&LRO অফিসে আবেদন পদ্ধতি ও বর্গা জমি ফেরত পাওয়ার উপায়
জমির বর্গা কাটানোর নিয়ম, আবেদন পদ্ধতি ও বর্গা জমি ফেরত পাওয়ার উপায় জানুন সহজ বাংলায়।

আপনার জমি অন্যের হাতে বর্গায় চাষ হচ্ছে, আর আপনি জমি ফেরত চান? অনেকে ভাবেন, জমি নিজের নামে থাকলে যখন খুশি বর্গাদারকে সরিয়ে দেওয়া যায়। পশ্চিমবঙ্গে বাস্তবে নির্দিষ্ট আইনি কারণ ছাড়া এমনটা করা যায় না। এই প্রতিবেদনে সহজ ভাষায় জানবেন - কোন কারণে বর্গা কাটানো যায়, জমির বর্গা তোলার নিয়ম কী, কোথায় আবেদন করবেন, আবেদনের পর কী হয় এবং আবেদন বাতিল হলে কী করবেন।

জমির বর্গা তোলার নিয়ম কী? (Barga record tolar niyom)

বর্গা কাটানো মানে আইন মেনে বর্গাদারের চাষের অধিকার শেষ করা। পশ্চিমবঙ্গ ভূমি সংস্কার আইন ১৯৫৫ এর ১৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী, রাজ্য সরকারের নিযুক্ত অফিসারের (সাধারণত BL&LRO) আদেশ ছাড়া কেউ নিজের জমিতে বর্গাদারের চাষ বন্ধ করতে পারেন না। আর ৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী এই আইন কোনো চুক্তি, প্রথা বা সমঝোতার ওপরেও প্রাধান্য পায়। তাই মুখের কথা বা সাদা কাগজের চুক্তিতে বর্গা কাটানো সম্ভব না।

বর্গাদার কাকে বলে?

আইন অনুযায়ী, যিনি বর্গা বা ভাগ প্রথায় অন্যের জমি চাষ করে ফসলের ভাগ দেন, তিনিই বর্গাদার। কিষানী প্রথাও এর মধ্যে পড়ে। তবে জমির মালিকের সন্তান, নাতি-নাতনি, বাবা-মা, ভাই-বোনের মতো নিকট আত্মীয় আইনের চোখে বর্গাদার নন। আইনত চাষ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তিনিই বর্গাদার থাকেন।

পশ্চিমবঙ্গের আইনে কোন কোন কারণে বর্গা কাটানো যায়? (Reasons for barga record cancellation in west bengal)

১৭ নম্বর ধারায় বর্গা কাটানোর প্রধানত চারটি কারণ আছে। এর বাইরে আরও কিছু কারণ আছে, যেগুলো বর্গা কাটানোর কারণ হতে পারে।

১. বর্গাদার জমি চাষ না করলে

যদি বর্গাদার কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া জমি চাষ না করেন, অথবা কৃষিকাজ ছাড়া অন্য কাজে জমি ব্যবহার করেন। যেমন, জমিতে গোডাউন বা ঘর বানালে বর্গা কাটা যায়। অন্যদিকে যদি বন্যা, গুরুতর অসুস্থতার মতো কারণে বর্গাদার চাষ না করে থাকলে বর্গা কাটানো যায় না।

২. বর্গাদার ফসলের ভাগ না দিলে

বর্গাদারকে নির্ধারিত সময়ে মালিকের ভাগ দিতে হয় এবং দু’পক্ষ রসিদ দেয়। মালিক ভাগ নিতে না চাইলে বা রসিদ না দিলে বর্গাদার সেই ভাগ সরকার-নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে পারেন। কিন্তু বর্গাদার পুরো ভাগ না দিলে মালিক BL&LRO এর কাছে আবেদন করে বর্গা চাষ বন্ধের আদেশ নিতে পারেন। তবে কর্তৃপক্ষ বর্গাদারকে সময় দিলে সেই সময়ের মধ্যে ভাগ পরিশোধ করলে আদেশ কার্যকর হয় না।

আইনে ফসলের ভাগের নির্দিষ্ট পরিমাণ

কে কী দিচ্ছেনবর্গাদারের ভাগমালিকের ভাগ
জমির মালিক লাঙ্গল, সার ও বীজ দিলে৫০%৫০%
অন্য সব ক্ষেত্রে৭৫%২৫%
অন্যদিকে জমির মালিক যদি নিজে জোর করে পুরো ফসল তুলে নেন, তাহলে বর্গাদার তাঁর ভাগ বা তার দাম আদায় করতে পারেন (১৬এ ধারা অনুযায়ী)।

৩. বর্গাদার নিজে চাষ না করে অন্যকে দিয়ে চাষ করালে

আইন অনুযায়ী, বর্গাদারকে নিজে চাষ করতে হবে। তবে পরিবারের সদস্যদের সাহায্য নিয়ে চাষ করলে তা ‘নিজে চাষ’ বলেই ধরা হয়। সমস্যা হয় তখন, যখন বর্গাদার জমি অন্য কাউকে চাষ করতে দেন। উদাহরণ: ধরুন রহিম বর্গাদার, কিন্তু নিজে চাষ না করে জমিটা করিমকে ভাগে দিয়ে দিলেন। এটি বর্গা কাটার কারণ হতে পারে।

৪. জমির মালিক নিজের জমি নিজে চাষ করতে চাইলে

জমির মালিক সত্যিই (Bona Fide) নিজে চাষ করতে চাইলে বর্গা কাটাতে পারেন, তবে দুটি শর্ত আছে:

  1. মালিকের নিজের চাষের মোট জমি, বর্গা জমি সহ, ৩ হেক্টর (প্রায় ৭.৪ একর) ছাড়াতে পারবে না।
  2. বর্গাদারের হাতে কমপক্ষে ১ হেক্টর (প্রায় ২.৪৭ একর) জমি অবশ্যই থাকতে হবে।

উদাহরণ:

  • ধরুন, মালিকের নিজের চাষের ইতিমধ্যে ২ হেক্টর জমি আছে।
  • তাঁর আরও ২ হেক্টর জমি বর্গাদারের হাতে আছে, আর তিনি পুরো ২ হেক্টর ফেরত নিতে চান।
  • ফেরত পেলে মালিকের মোট জমি হবে ২ + ২ = ৪ হেক্টর, যা ৩ হেক্টরের বেশি।
  • তাই আইন অনুযায়ী তিনি বর্গাদারের কাছ থেকে সম্পূর্ণ ২ হেক্টর ফেরত নিতে পারবেন না। সর্বোচ্চ ১ হেক্টর ফেরত নিতে পারবেন, যাতে তাঁর মোট জমি ৩ হেক্টরে সীমিত থাকে।

আইনত 'নিজে চাষ' বলতে বোঝায়: নিজের শ্রমে, পরিবারের শ্রমে বা নগদ মজুরি দিয়ে লোক নিয়ে চাষ (ফসলের ভাগের বিনিময়ে নয়)। সঙ্গে শর্ত থাকবে যে মালিক বা তাঁর পরিবারকে বছরের বেশির ভাগ সময় ওই এলাকায় থাকতে হবে এবং তাদের আয়ের প্রধান উৎস হবে এই জমি।

বর্গা কাটানোর পর দুই বছরের মধ্যে মালিক নিজে চাষ না করলে, অথবা জমি অন্য কাউকে চাষ করতে দিলে জমি সরকারে ন্যস্ত (vest) হতে পারে। মালিক ১৪ভি ধারা অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ পাবেন, জমি নয়। তাই ‘নিজে চাষ করব’ বলে আবেদন করলে তা সত্যিই করতে হবে।

এছাড়াও আরও কিছু আইনি শর্ত থাকে জমির বর্গা কাটানোর জন্য। যেমন বর্গাদার স্বেচ্ছায় বর্গা ত্যাগ করে, তিনি যদি মারা যান এবং তাঁর কোনো উত্তরাধিকারী না থাকে, জমিটি যদি চাষ আবাদের যোগ্য না থাকে।

বর্গা কাটানোর জন্য কী কী কাগজপত্র লাগে? (Documents Required for Barga Cancellation)

আবেদনের ধরন ও কারণ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজ কম-বেশি হতে পারে। সাধারণত যেসব কাগজ গুলো লাগে তার তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

কাগজকী কাজে লাগে
খতিয়ান (ROR) ও দাগের তথ্যজমি আপনার নামে আছে এবং বর্গাদারের নাম আছে, তা দেখাতে
মালিকানার দলিল / মিউটেশনের কাগজজমিতে আপনার অধিকার প্রমাণ করতে
আপডেটেড খাজনার রসিদজমির সঙ্গে আপনার সম্পর্ক ও দায় দেখাতে
পরিচয় ও ঠিকানার প্রমাণআপনি ওই এলাকায় থাকেন কি না (নিজে চাষের শর্তে) বোঝাতে
ভাগ না পাওয়ার প্রমাণফসলের ভাগ না দেওয়ার কারণ প্রমাণ করতে
জমি পড়ে থাকা বা অন্য ব্যবহারের ছবি/সাক্ষীচাষ না করা বা কৃষির বাইরে ব্যবহার প্রমাণ করতে
পরিবার ও আয়ের তথ্যনিজে চাষ করতে চাওয়ার সদিচ্ছা (bona fide) বোঝাতে
বর্গাদারের সম্মতিপত্র (NOC), রাজি থাকলেবর্গা কাটানোয় বর্গাদারের কোনো আপত্তি নেই, তা বোঝাতে
মৃত্যুর সার্টিফিকেট ও বংশতালিকা (বর্গাদার মারা গেলে)বর্গাদারের মৃত্যু ও ওয়ারিসদের পরিচয় বোঝাতে

বর্গা কাটানোর জন্য কোথায় এবং কীভাবে আবেদন করবেন? (Barga record removal process)

রাজ্য সরকার যে অফিসার বা কর্তৃপক্ষকে নিযুক্ত করবে, তাঁর কাছেই আবেদন করতে হবে। বাস্তবে এলাকাভেদে সেটি ব্লকের BL&LRO বা মহকুমার SDO অফিস। বর্গা কাটানোর জন্য আবেদন দুই ভাবে করা যায়। একটি হলো অনলাইনে আবেদন আর একটি অফলাইনে আবেদন।

বর্গা কাটানোর অফলাইন আবেদন

BL&LRO অফিসে লিখিত আবেদনের জন্য একটি সাদা কাগজে দরখাস্ত লিখুন। এতে মৌজা, দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর, বর্গাদারের নাম, বর্গা কাটানোর কারণ এবং আপনার দাবি স্পষ্ট করে লিখুন। এই দরখাস্তে ১০ টাকার কোর্ট ফি স্ট্যাম্প লাগাতে হয়।

দরখাস্তের সঙ্গে এগুলো দিন:

  • জমির সব কাগজের জেরক্স কপি।
  • বর্গাদার রাজি থাকলে তাঁর লিখিত সম্মতিপত্র (NOC)। এটা স্বেচ্ছায় বর্গা ছাড়ার ক্ষেত্রে কাজে লাগে। বর্গাদার রাজি না হলে NOC লাগে না। তখন আইনে ঠিক করা কারণ ও প্রমাণ দিয়ে আবেদন করতে হয়।
  • বর্গাদার মারা গিয়ে থাকলে তাঁর উত্তরাধিকারীদের বংশতালিকা। উত্তরাধিকারীরা রাজি থাকলে তাঁদের সম্মতিও দিতে পারেন।
  • বাস্তবে অনেক অফিস আশেপাশের জমির মালিকদের NOC-ও চায়। আইনে এটা সরাসরি লেখা নেই, তাই আপনার অফিসে জেনে নিন।

সব কাগজ জমা দিয়ে অফিস থেকে অবশ্যই একটি রিসিভ কপি নিয়ে নিন।

বর্গা কাটানোর অনলাইন আবেদন

জমির রেকর্ড থেকে বর্গাদারের নাম কাটানোর জন্য বাংলার ভূমি পোর্টালের Public Grievance এর মাধ্যমে অনলাইন আবেদন করা যায়। প্রথমে বাংলার ভূমি পোর্টালে মোবাইল নম্বর ও পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করুন। যদি আগের থেকে অ্যাকাউন্ট না থাকে তাহলে একটি অ্যাকাউন্ট তৈরি করে নিন।

Public Grievance: লগইনের পর Public Grievance খুলে Grievance Application বেছে নিন।

Banglarbhumi Public Grievance থেকে Grievance Application বেছে নিয়ে জমি বর্গা কাটানোর জন্য অনলাইন আবেদনপদ্ধতি
Banglarbhumi পোর্টালে Public Grievance এর মাধ্যমে জমির বর্গা কাটানোর নিয়ম।

ফর্ম পূরণ: Grievance Application ফর্মে নিজের ও জমির তথ্য ঠিকভাবে দিন। ফর্মের প্রতিটি ঘর কীভাবে পূরণ করবেন, তা ধাপে ধাপে দেখতে Public Grievance ফর্ম পূরণের পূর্ণ গাইড পড়ুন। Petition details বা বিবরণের ঘরে নিচের নমুনা অনুযায়ী বর্গা কাটানোর কারণ লিখুন।

Petition details-এ যেভাবে লিখবেন

প্রাপক মাননীয় ভূমি ও ভূমি সংস্কার আধিকারিক ব্লক ............ জেলা: .........., পশ্চিমবঙ্গ বিষয়: জমির রেকর্ড থেকে বর্গাদারের নাম বাদ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন। মহাশয়, সবিনয় নিবেদন এই যে, আমি .................., পিতা বা স্বামীর নাম .................., গ্রাম .................., ডাকঘর .................., থানা .................., জেলা .................. এর স্থায়ী বাসিন্দা। আমার মালিকানাধীন জমির বিবরণ নিম্নরূপ: ১। মৌজার নাম: .................. ২। জে এল নম্বর: .................. ৩। খতিয়ান নম্বর: .................. ৪। দাগ নম্বর: .................. ৫। জমির মোট পরিমাণ: .................. ৬। রেকর্ডে নথিভুক্ত বর্গাদারের নাম: .................. উক্ত জমির রেকর্ডে বর্গাদার হিসেবে .................. এর নাম নথিভুক্ত রয়েছে। বর্তমানে উক্ত বর্গা সংক্রান্ত রেকর্ড সংশোধনের প্রয়োজন হয়েছে, যার কারণ নিম্নরূপ .................................................. .................................................. আমার আবেদনের সমর্থনে প্রাসঙ্গিক নথিপত্র ও প্রমাণাদি পেশ করতে ইচ্ছুক। অতএব, মহাশয়ের কাছে বিনীত প্রার্থনা, বিষয়টি তদন্ত করে উক্ত জমির রেকর্ড থেকে বর্গাদারের নাম বাদ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। নিবেদক স্বাক্ষর .................. নাম .................. মোবাইল নম্বর .................. তারিখ .................. স্থান ..................

জমা দেওয়া: ফর্ম পূরণ হলে ক্যাপচা কোড বসিয়ে Submit করুন। একটি পেটিশন নম্বর (UPN) পাবেন, যত্ন করে রেখে দিন। স্ট্যাটাস চেক ও RI ইনকোয়ারির সময় এটা কাজে লাগবে।

আবেদন জমা দেওয়ার পর RI ইনকোয়ারি কীভাবে হয়?

আবেদন জমা পড়ার পর সাধারণত BL&LRO অফিস থেকে RI (Revenue Inspector) জমি পরিদর্শনে আসবেন। RI অফিসার জমির আসল অবস্থা দেখবেন, যেমন কে চাষ করছেন, জমি পড়ে আছে কি না, বা কৃষির বাইরে অন্য কাজে ব্যবহার হচ্ছে কি না। তিনি আপনার আবেদনের তথ্য (মৌজা, দাগ ও খতিয়ান নম্বর) জমির সঙ্গে মেলাবেন এবং প্রয়োজনে স্থানীয় সাক্ষীদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। এরপর তিনি BL&LRO অফিসে এই লিখিত রিপোর্ট দেবেন। আপনার আবেদনের সিদ্ধান্তে এই রিপোর্টের বড় ভূমিকা থাকে।

ইনকোয়ারির দিন আপনি যা করবেন

  • জমিতে নিজে উপস্থিত থাকুন বা বিশ্বস্ত কাউকে পাঠান।
  • দাগ নম্বর ও সীমানা ঠিকমতো দেখিয়ে দিন।
  • জমির কাগজ, ছবি ও আবেদনের রিসিভ কপি (বা UPN) সঙ্গে রাখুন।
  • সাক্ষী থাকলে তাঁদের নাম ও ঠিকানা জানিয়ে দিন।

শুনানি ও আদেশ

RI রিপোর্ট অফিসে জমার কিছু সময় পর (১মাস বা তার বেশীও হতে পারে) শুনানির অফিসার দুই পক্ষকে নোটিস দিয়ে ডাকবেন। আপনার জমির সব কাগজ, সম্মতিপত্র (NOC) ও সাক্ষী নিয়ে শুনানির দিনে উপস্থিত থাকুন। এই দিন বর্গাদার বা তাঁর ওয়ারিসও নিজের কথা বলার সুযোগ পাবেন। শুনানির শেষে আদেশ আপনার পক্ষে এলে সেই অনুযায়ী জমির রেকর্ডে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করা হয়।

অনেক সময় দেখা যায়, রিপোর্ট আপনার পক্ষে গেলেও সিদ্ধান্ত আসতে দেরি হয়। এক্ষেত্রে মাঝেমধ্যে অফিসে খোঁজ নিন, আর ধৈর্য হারাবেন না। আর যদি আদেশ আপনার পক্ষে না এলে ভেঙে পড়বেন না, আপনার সামনে আরও পথ খোলা আছে:

  • মিস কেসের অর্ডারশিট তুলে নিন।
  • RTI করে RI রিপোর্টটি তুলুন।
  • আদেশের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে জেলার কালেক্টরের কাছে আপিল করুন (১৯ ধারায়)।
  • প্রয়োজনে আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে আদালতে যান।

পুরো প্রক্রিয়ায় কত সময় লাগবে, তা আগে থেকে বলা যায় না। কয়েক মাস বা তার বেশিও সময় লাগতে পারে।

সাধারণ জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী FAQs

প্রশ্ন: বর্গাদার মারা গেলে তাঁর বর্গা কি কাটা যায়?

উত্তর: বর্গাদার মারা গেলেই বর্গা আপনা-আপনি শেষ হয়ে যায় না। আইনে তাঁর ওয়ারিসরা চাষের অধিকার পান, তবে বিক্রি বা হস্তান্তর করা যায় না (১৫ ও ১৫এ ধারা)। ওয়ারিসরা চাষ না করলে বা ফসলের ভাগ না দিলে, জমির মালিক বর্গা কাটানোর আবেদন করতে পারেন।

প্রশ্ন: বর্গা কাটানোর পর জমি কি বিক্রি করা যাবে?

উত্তর: সাধারণত যাবে। রায়তি জমি বিক্রি করা যায়, তবে নিবন্ধিত দলিলসহ আইনের কিছু শর্ত মানতে হয়। কিন্তু নিজে চাষের কথা বলে বর্গা কাটিয়ে খুব তাড়াতাড়ি জমি বিক্রি করলে প্রশ্ন উঠতে পারে। তাই বিক্রির আগে একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

প্রশ্ন: বর্গা কাটানোর আবেদন কি অনলাইনে করা যায়?

উত্তর: হ্যাঁ, বাংলার ভূমি পোর্টালের Public Grievance অপশনে অনলাইনে আবেদন করা যায়। লগইন করে Grievance Application বেছে নিন, ফর্ম পূরণ এবং পেটিশন ডিটেইলসের ঘরে বর্গা তোলার কারণ লিখে Submit করুন। এরপর যে পেটিশন নম্বর পাবেন তা রেখে দিন।

প্রশ্ন: বর্গাদার দীর্ঘদিন জমি চাষ না করলে কী করবেন?

উত্তর: বিনা কারণে বহুদিন চাষ না করলে বর্গা কাটানোর আবেদন করা যায়। আগে প্রমাণ জোগাড় করুন, যেমন জমি পড়ে থাকার ছবি ও গ্রামের সাক্ষী। তারপর অফিসারের কাছে লিখিত আবেদন করুন। জমিতে ঢুকে জোর করে দখল নেবেন না।

প্রশ্ন: বর্গাদার স্বেচ্ছায় বর্গা ছেড়ে দিলে কীভাবে রেকর্ড করাবেন?

উত্তর: বর্গাদার নিজে থেকে জমি ছেড়ে দিতে চাইলে কাজটা মুখের কথায় হবে না। আইনের ২০বি ধারা অনুযায়ী বিষয়টি নির্ধারিত অফিসারকে জানাতে হয়। অফিসার তদন্ত করে দেখেন, ছাড়াটা সত্যিই স্বেচ্ছায় কি না। জোর বা চাপে ছাড়লে বর্গাদারকে জমিতে ফেরানো হয়। তাই বর্গাদারের লিখিত সম্মতিপত্র (NOC) নিয়ে অফিসে আবেদন করুন। একটি কথা মনে রাখবেন, স্বেচ্ছায় ছাড়ার পর মালিকের নিজে চাষের সুবিধা কিছুটা সীমিত হতে পারে। তাই আগে আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে নিন।

প্রশ্ন: বর্গা কাটার আবেদন খারিজ হলে আবার আপিল করা যায়?

উত্তর: হ্যাঁ, আপিল করা যায়। বর্গা কাটানোর আদেশ পছন্দ না হলে আপনি জেলার কালেক্টরের কাছে আপিল করতে পারেন। এটা আইনের ১৯ ধারায় আছে। বর্গাদারও আদেশের বিরুদ্ধে একইভাবে আপিল করতে পারেন। আপিলের সময় আদেশের তারিখ থেকে ৩০ দিন, তাই দেরি করবেন না।

প্রশ্ন: বর্গা কাটানো ও বর্গাদার উচ্ছেদ কি একই বিষয়?

উত্তর: শুনতে এক মনে হলেও আইনে দুটোই আলাদা। বর্গা কাটানো মানে অফিসারের আদেশ নিয়ে বর্গাদারের চাষ বন্ধ করা, যা আইনসম্মত। আর উচ্ছেদ বলতে সাধারণত জোর করে সরিয়ে দেওয়া বোঝায়, যা বেআইনি। সঠিক পথ একটাই: আবেদন, শুনানি, তারপর আদেশ।

শেষ কথা

জমির বর্গা রেকর্ড তোলা একটি ধাপে ধাপে চলা আইনি প্রক্রিয়া। বর্গা কাটার কারণ ঠিক করুন, প্রমাণ গুছিয়ে রাখুন, সঠিক ভাবে আবেদন করুন, শুনানিতে হাজির থাকুন এবং আদেশের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করুন। মনে রাখবেন জোর করে জমি নেওয়ার চেষ্টা করলে আপনার মামলাকেই দুর্বল করে দেবে। এই প্রতিবেদনটি কোনো আইনি পরামর্শ নয়।

আবেদনের আগে স্থানীয় BL&LRO অফিস এবং একজন অভিজ্ঞ ভূমি-আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলুন। আইন ও নিয়ম বদলাতে পারে, তাই সবসময় আপডেটেড তথ্য যাচাই করুন। বর্গা কাটানো নিয়ে আপনার কোনো প্রশ্ন থাকলে কমেন্টে জানান। আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব।

তথ্যসূত্র: West Bengal Land Reforms Act, 1955 (সরকারি পাঠ), পশ্চিমবঙ্গ ভূমি ও ভূমি সংস্কার ম্যানুয়াল এবং সুপ্রিম কোর্টের রায়ের সারাংশ।
Digital Bhumi
Ali Ahmed

আমি তিন বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের জমি-জমা ও সরকারি প্রকল্প নিয়ে কাজ করছি। ভূমি পোর্টালের কাজগুলো নিজে দেখি, সরকারি নোটিস মিলিয়ে দেখি, তারপর সহজ ভাষায় লিখি। যাতে সাধারণ মানুষ নিজেই আবেদন করতে পারেন।

Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url