পশ্চিমবঙ্গে জমি রেজিস্ট্রি করতে কী কী লাগে?
সারাজীবনের জমানো টাকায় এক টুকরো জমি বা স্বপ্নের ফ্ল্যাট কেনার আনন্দ এক নিমিষেই মাটি হয়ে যেতে পারে, যদি রেজিস্ট্রেশনের সময় কোনো আইনি ভুল হয়। অনেকেই সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে গিয়ে জানতে পারেন যে তাদের কাছে সঠিক বা আপডেট কাগজপত্র নেই, অথবা জমির পুরনো দলিলে বড় কোনো ভুল রয়ে গেছে। এর ফলে শুধু সময় আর টাকারই অপচয় হয় না, ভবিষ্যৎও এক বিশাল আইনি জটিলতার মুখে পড়তে হয়।
অনেকেই গুগলে জমি রেজিস্ট্রি করার সঠিক নিয়ম খোঁজেন, কিন্তু বেশিরভাগ জায়গাতেই ভুলভাল বা পুরনো তথ্য থাকে। এই লেখাটি তাদের জন্য, যারা পশ্চিমবঙ্গে জমি, বাড়ি বা ফ্ল্যাট কিনে রেজিস্ট্রি করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এখানে আপনি জানতে পারবেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘ই-নথিকরণ’ পোর্টাল এবং IGR-এর নতুন নিয়ম অনুযায়ী জমি, বাড়ি বা ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রি করতে ক্রেতা, বিক্রেতা আর সাক্ষীদের ঠিক কী কী কাগজপত্র লাগবে। সাথে এটাও জেনে নিন—রেজিস্ট্রেশনের আগে কী কী বিষয় মিলিয়ে দেখা জরুরি এবং কোন ভুলের জন্য রেজিস্ট্রি বাতিল পর্যন্ত হতে পারে। চলুন, একদম সরকারি নিয়ম মেনে আপনার স্বপ্নের সম্পত্তি কেনাকে শতভাগ সুরক্ষিত করে নিই!
জমি রেজিস্ট্রেশনের জন্য প্রয়োজনীয় মূল ডকুমেন্টস
| প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট | কার জন্য প্রযোজ্য | কেন লাগে | বাধ্যতামূলক কি না |
|---|---|---|---|
| আধার বা ভোটার কার্ড | ক্রেতা, বিক্রেতা, সাক্ষী | পরিচয় ও ঠিকানা যাচাই করা এবং বায়োমেট্রিক মেলানোর জন্য। | হ্যাঁ |
| প্যান কার্ড / ফর্ম ৬০ | ক্রেতা, বিক্রেতা | আয়করের নিয়ম মেনে (১০ লক্ষ টাকার বেশি লেনদেনের ক্ষেত্রে)। | হ্যাঁ (না থাকলে Form 60) |
| মাদার দলিল (পুরোনো দলিল) | বিক্রেতা | বিক্রেতার মালিকানা প্রমাণের জন্য (Title verification)। | হ্যাঁ |
| আপডেটেড পরচা (RoR) | বিক্রেতা | সরকারি রেকর্ডে (বাংলারভূমি) কার নামে জমি আছে সেটা দেখতে। | হ্যাঁ |
| খাজনার রসিদ | বিক্রেতা | জমির খাজনা বা সম্পত্তি করের কোনো বকেয়া নেই—এটি প্রমাণ করতে। | হ্যাঁ |
| পাসপোর্ট সাইজ ছবি | ক্রেতা, বিক্রেতা, সাক্ষী | দলিলে যুক্ত করার জন্য এবং ডিজিটাল রেকর্ডের জন্য। | হ্যাঁ (সাম্প্রতিক ছবি) |
| ই-অ্যাসেসমেন্ট স্লিপ | ক্রেতা | স্ট্যাম্প ডিউটি ও মার্কেট ভ্যালু নির্ধারণের প্রমাণ হিসাবে। | হ্যাঁ |
| GRIPS পেমেন্ট চালান | ক্রেতা | সরকারি ফি অনলাইনে জমা দেওয়ার প্রমাণ হিসাবে। | হ্যাঁ |
জমি রেজিস্ট্রেশনের আগে কি কি যাচাই করবেন?
রেজিস্ট্রেশনের দিন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যাওয়ার আগে নিজের নিরাপত্তার জন্য নিচের বিষয়গুলো অবশ্যই যাচাই করে নিন।
মালিকানা যাচাই (Title Verification): যিনি জমিটি বিক্রি করছেন, তিনি সত্যিই ওই জমির বর্তমান ও বৈধ মালিক কি না, তা নিশ্চিত করুন। এজন্য আগের দলিল (Mother Deed) এবং অন্যান্য মালিকানার কাগজপত্র ভালোভাবে দেখে মিলিয়ে নিন। এতে ভবিষ্যতে মালিকানা নিয়ে বিরোধ বা আইনি জটিলতায় পড়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে।
সার্চিং (Encumbrance Check): WB Registration পোর্টালে গত ১২–১৫ বছরের রেকর্ড (Searching) দেখে নিশ্চিত হয়ে নিন, জমিটি আগে অন্য কারও কাছে বিক্রি হয়েছে কি না। পাশাপাশি দেখুন, জমিটি কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে বন্ধক (মর্টগেজ) রাখা আছে কি না। এই যাচাই করলে ভবিষ্যতে প্রতারণা ও আইনি জটিলতার ঝুঁকি অনেকটাই কমে।
মামলা-মোকদ্দমা যাচাই (Pending Court Cases): জমিটি নিয়ে কোনো আদালতে মামলা, ইনজাংশন বা অন্য কোনো আইনি বিরোধ চলছে কি না, তা একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে যাচাই করে নিন। মামলা চলমান জমি কিনলে পরে মালিকানা নিয়ে ঝামেলা ও আইনি সমস্যায় পড়তে হতে পারে।
বকেয়া বিল যাচাই (Outstanding Dues): জমিটির নামে পঞ্চায়েত বা পৌরসভার প্রপার্টি ট্যাক্স, বিদ্যুৎ বিল বা অন্য কোনো সরকারি বকেয়া আছে কি না, তা আগে থেকেই দেখে নিন। কোনো বকেয়া থাকলে পরে নতুন মালিক হিসেবে আপনাকেই সেই টাকা পরিশোধ করতে হতে পারে।
বিশেষ জমি রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস
সাধারণ কেনাবেচার বাইরে কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশনের নিয়ম ও ডকুমেন্টস আলাদা হয়।
| বিশেষ পরিস্থিতি | প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট / শর্ত |
|---|---|
| উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমি (Inherited Property) | উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমি বিক্রি করতে হলে মৃত্যু প্রমাণপত্র (Death Certificate) এবং পঞ্চায়েত বা পৌরসভা থেকে পাওয়া ওয়ারিশান প্রমাণপত্র (Legal Heir Certificate) জমা দিতে হবে। প্রয়োজন হলে অন্যান্য উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত ডকুমেন্টসও লাগতে পারে। |
| দানপত্র দলিল (Gift Deed) | পরিবারের সদস্যদের মধ্যে (যেমন- বাবা থেকে ছেলে) সম্পত্তি হস্তান্তর হলে স্ট্যাম্প ডিউটিতে ছাড় পাওয়া যায় (Registration Act অনুযায়ী)। এক্ষেত্রে সম্পর্কের প্রমাণপত্র (যেমন- জন্ম সার্টিফিকেট, ভোটার কার্ডের বাবার নাম) জমা দিতে হয়। |
| পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি (Power of Attorney) | জমির মালিক নিজে উপস্থিত থাকতে না পারলে, যাকে পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি (Attorney) দেওয়া হয়েছে তিনি রেজিস্ট্রির কাজ করতে পারেন। তবে এর জন্য বৈধ রেজিস্টার্ড পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি (Registered Power of Attorney) দলিল জমা দিতে হবে। শুধু নোটারি করা বা আনরেজিস্টার্ড পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি দিয়ে জমি বিক্রি করা যায় না। |
| যৌথ সম্পত্তি (Joint Property) | জমির একাধিক মালিক থাকলে, দলিলে সবার স্বাক্ষর এবং ছবি বাধ্যতামূলক। কেউ উপস্থিত থাকতে না পারলে তার কাছ থেকে রেজিস্টার্ড PoA নিতে হবে। |
| কোম্পানি মালিকানাধীন সম্পত্তি (Company Owned Property) | ক্রেতা বা বিক্রেতা যদি কোনো কোম্পানি হয়, তবে কোম্পানির প্যান কার্ড, মেমোরেন্ডাম অফ অ্যাসোসিয়েশন (MoA), আর্টিকেলস অফ অ্যাসোসিয়েশন (AoA) এবং বোর্ড অফ ডিরেক্টরস-এর বোর্ড রেজোলিউশন (Board Resolution) কপি জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। |
| নাবালকের সম্পত্তি (Minor's Property) | ১৮ বছরের কম বয়সী কোনো নাবালকের সম্পত্তি বিক্রি করতে হলে আগে আদালতের অনুমতি (Court Permission) নিতে হবে। এই অনুমতির ডকুমেন্টস ছাড়া সাধারণত জমির রেজিস্ট্রি করা যায় না। |
| কৃষিজমি (Agricultural Land) | বড় পরিমাণ কৃষিজমি কিনলে পশ্চিমবঙ্গ ভূমি সংস্কার আইন অনুযায়ী জমি রাখার সর্বোচ্চ সীমা (Ceiling) প্রযোজ্য হতে পারে। তাই প্রয়োজন হলে নির্ধারিত ঘোষণা (Declaration) বা সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র জমা দিতে হতে পারে। |
| লিজহোল্ড সম্পত্তি (Leasehold Property) | সরকার বা কোনো সংস্থা (যেমন— KMDA) থেকে লিজ নেওয়া জমি বিক্রি বা অন্যের নামে ট্রান্সফার করতে হলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনাপত্তি প্রমাণপত্র (NOC) বা ট্রান্সফার পারমিশন নিতে হতে পারে। এই অনুমতি ছাড়া সাধারণত রেজিস্ট্রির কাজ সম্পন্ন করা যায় না। |
ক্রেতা, বিক্রেতা ও সাক্ষীর কি কি ডকুমেন্টস লাগবে
ক্রেতার (Buyer) কী কী ডকুমেন্টস লাগে?
- পরিচয়পত্র: পরিচয়পত্র হিসেবে আধার কার্ড বা ভোটার আইডি জমা দিতে হবে। তবে বায়োমেট্রিক যাচাইয়ের জন্য আধার কার্ড থাকলে সুবিধা হয়।
- প্যান কার্ড (PAN Card): সম্পত্তির বাজারমূল্য ১০ লক্ষ টাকার বেশি হলে প্যান কার্ড জমা দিতে হবে। প্যান কার্ড না থাকলে তার পরিবর্তে Form 60 পূরণ করে জমা দিতে হবে।
- পাসপোর্ট সাইজ ছবি: বর্তমানে বেশিরভাগ সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে রেজিস্ট্রির সময় ডিজিটাল ছবি তোলা হয়। তবে নিজের কাছে ২–৩ কপি সাম্প্রতিক রঙিন পাসপোর্ট সাইজ ছবি রাখলে ভালো হয়।
- ই-অ্যাসেসমেন্ট (e-Assessment) কপি: অনলাইনে পূরণ করা e-Requisition ফর্মের প্রিন্ট কপি বা রেফারেন্স নম্বর সঙ্গে রাখুন।
- খসড়া দলিল (Draft Deed): রেজিস্ট্রির জন্য প্রস্তুত করা খসড়া দলিলের প্রিন্ট কপি সঙ্গে রাখতে হবে।
- ই-পেমেন্টের রসিদ (e-Payment Receipt): স্ট্যাম্প ডিউটি ও রেজিস্ট্রেশন ফি অনলাইনে পরিশোধ করলে তার রসিদ বা পেমেন্টের প্রমাণপত্র সঙ্গে রাখুন।
- ই-অ্যাপয়েন্টমেন্টের প্রমাণ (e-Appointment): অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করলে তার স্লিপ বা বুকিংয়ের প্রমাণ সঙ্গে রাখুন।
বিক্রেতার (Seller) কী কী ডকুমেন্টস লাগে?
- পরিচয়পত্র ও প্যান কার্ড: (ক্রেতার মতোই প্রযোজ্য)।
- মাদার দলিল (Previous Title Deed): বিক্রেতা কীভাবে এই জমির মালিক হয়েছেন তার প্রমাণ হিসাবে।
- আপডেটেড পরচা (RoR): বাংলারভূমির রেকর্ডে জমির মালিক হিসেবে বিক্রেতার নাম রয়েছে—এমন আপডেটেড পরচা সঙ্গে রাখতে হবে।
- খাজনার রসিদ (Khajna Receipt): আপ-টু-ডেট জমির ট্যাক্স বা পঞ্চায়েত/পৌরসভার কর জমা দেওয়ার রসিদ।
সাক্ষীর (Witness) কী কী ডকুমেন্টস লাগে?
- সংখ্যা: আইন অনুযায়ী কমপক্ষে ২ জন সাবালক সাক্ষী প্রয়োজন।
- ডকুমেন্টস: সাক্ষীদের আধার কার্ড বা ভোটার কার্ড এবং পাসপোর্ট সাইজের ছবি।
- ভূমিকা: সাক্ষীরা নিশ্চিত করেন যে, তাদের সামনেই ক্রেতা ও বিক্রেতা দলিলে সই করেছেন এবং জমি কেনাবেচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে জমির রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া
পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে 'ই-নথিকরণ' (e-Nathikaran) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন হয়।
ধাপ ১: e-Assessment (ই-অ্যাসেসমেন্ট)
মনে রাখবেন: e-Assessment Slip কেবল একটি প্রাথমিক হিসাব। রেজিস্ট্রির দিন সাব-রেজিস্ট্রার জমির তথ্য ও দলিল যাচাই করে প্রয়োজন হলে স্ট্যাম্প ডিউটি, রেজিস্ট্রেশন ফি বা অন্যান্য চার্জের হিসাব পরিবর্তন করতে পারেন। তাই চূড়ান্ত ফি রেজিস্ট্রির সময়ই নির্ধারিত হয়।এছাড়া, e-Assessment Query Slip সাধারণত ৩০ দিন পর্যন্ত বৈধ থাকে। এই সময়ের মধ্যে রেজিস্ট্রির পরবর্তী ধাপ সম্পন্ন না করলে নতুন করে e-Assessment করতে বা নিয়ম অনুযায়ী এর মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করতে হতে পারে।
ধাপ ২: e-Deed Generation (খসড়া দলিল তৈরি)
e-Assessment সম্পন্ন হলে WB Registration পোর্টালের "Preparation and Submission of e-Deed" অপশনে গিয়ে খসড়া দলিল (Draft e-Deed) তৈরি করতে হবে। এখানে জমির মালিকানার তথ্য, কেনাবেচার শর্ত, জমির সীমানা, ক্রেতা-বিক্রেতা ও সাক্ষীদের তথ্য, মূল্য পরিশোধের বিবরণ এবং প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস আপলোড করতে হয়। সব তথ্য ঠিক আছে কি না যাচাই করে খসড়া দলিলটি অনলাইনে জমা দিতে হবে। এরপর রেজিস্ট্রেশন কর্তৃপক্ষ দলিলটি পরীক্ষা করবেন। কোনো সংশোধনের প্রয়োজন হলে বা দলিল অনুমোদিত হলে আবেদনকারীকে SMS এর মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হয়।ধাপ ৩: e-Payment (GRIPS পেমেন্ট)
e-Deed অনুমোদনের পর GRIPS (Government Receipt Portal System)-এর মাধ্যমে অনলাইনে স্ট্যাম্প ডিউটি ও রেজিস্ট্রেশন ফি জমা দিতে হয়। পেমেন্ট করার সময় e-Assessment Query Number ব্যবহার করতে হয়। পেমেন্ট সফল হলে একটি GRN (Government Reference Number) এবং e-Challan তৈরি হয়। এই চালানটি ডাউনলোড বা প্রিন্ট করে সংরক্ষণ করতে হবে, কারণ রেজিস্ট্রির সময় এটি প্রয়োজন হয়।
ধাপ ৪: e-Appointment (ই-অ্যাপয়েন্টমেন্ট)
স্ট্যাম্প ডিউটি ও রেজিস্ট্রেশন ফি জমা দেওয়ার পর WBREgistration পোর্টালে রেজিস্ট্রির জন্য একটি তারিখ ও সময় (Slot) বুক করতে হয়। আবেদনকারী নিজের সুবিধামতো সাব-রেজিস্ট্রার অফিস, তারিখ ও সময় নির্বাচন করতে পারেন। বুকিং সম্পন্ন হলে একটি Appointment Slip তৈরি হয়, যা প্রিন্ট বা ডাউনলোড করে রাখতে হয়।
ধাপ ৫: Physical Registration (রেজিস্ট্রি অফিসে উপস্থিতি)
নির্ধারিত দিন ও সময়ে ক্রেতা, বিক্রেতা এবং ২ জন সাক্ষীকে প্রয়োজনীয় মূল কাগজপত্র নিয়ে সাব-রেজিস্ট্রার (ADSR/DSR) অফিসে উপস্থিত হতে হয়। সেখানে সবার ছবি তোলা, আঙুলের ছাপ (বায়োমেট্রিক) নেওয়া এবং দলিলে স্বাক্ষর করানো হয়। সব তথ্য ও নথি যাচাই শেষে সাব-রেজিস্ট্রার দলিলটি নিবন্ধন (Registration) সম্পন্ন করেন।
পশ্চিমবঙ্গে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হওয়ার পর দলিল প্রস্তুত হতে সাধারণত ৭–৩০ কার্যদিবস সময় লাগতে পারে। তবে এটি সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের কাজের চাপ, নথি যাচাই এবং ডিজিটাল প্রসেসিংয়ের উপর নির্ভর করে।
রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে সাব-রেজিস্ট্রার অফিস থেকে একটি রসিদ (Receipt of Admission) দেওয়া হয়। এই রসিদে Presentation Number ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য থাকে। পরবর্তীতে নিবন্ধিত দলিল (Registered Deed) সংগ্রহ করার সময় এই রসিদটি দেখাতে হয়। তাই এটি যত্নসহকারে সংরক্ষণ করা উচিত।
জমি রেজিস্ট্রেশন সম্পূর্ণ হওয়ার পর কি করবেন?
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
একজন বিশেষজ্ঞ হিসাবে আমার পরামর্শ
সচারচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQs)
প্রশ্ন: প্যান কার্ড না থাকলে কি জমি রেজিস্ট্রি করা যাবে?
উত্তর: সম্পত্তির মূল্য ১০ লক্ষ টাকার কম হলে প্যান কার্ড লাগে না। কিন্তু ১০ লক্ষ টাকার বেশি হলে এবং প্যান কার্ড না থাকলে Form 60 পূরণ করে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।
প্রশ্ন: পুরোনো আসল দলিল (মাদার দলিল) হারিয়ে গেলে কী করণীয়?
উত্তর: আসল দলিল হারিয়ে গেলে প্রথমে থানায় FIR/GD করতে হবে এবং খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিতে হবে। এরপর রেজিস্ট্রি অফিস থেকে সার্টিফায়েড কপি (Certified Copy) তুলে সেটি দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করা যেতে পারে (তবে আইনজীবীর পরামর্শ বাঞ্ছনীয়)।
প্রশ্ন: জমি রেজিস্ট্রি হতে কতদিন সময় লাগে?
উত্তর: অনলাইনে অ্যাসেসমেন্ট ও পেমেন্ট করতে ১-২ দিন সময় লাগে। এরপর অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে অফিসে গেলে ওই দিনই রেজিস্ট্রেশনের মূল কাজ (ছবি ও আঙুলের ছাপ) সম্পন্ন হয়ে যায়।
প্রশ্ন: পরিবারের সদস্যরা কি সাক্ষী হতে পারেন?
উত্তর: হ্যাঁ, পরিবারের যেকোনো সাবালক সদস্য, যাদের বৈধ পরিচয়পত্র আছে, তারা সাক্ষী হতে পারেন। তবে সাধারণত এমন কাউকে সাক্ষী রাখা ভালো, যিনি সম্পত্তির লেনদেনের সাথে সরাসরি যুক্ত নন (Neutral witness)।
প্রশ্ন: NRI বা প্রবাসী ভারতীয়রা কীভাবে জমি কিনবেন বা রেজিস্ট্রি করবেন?
উত্তর: NRI-রা সরাসরি উপস্থিত থাকতে না পারলে, তারা ভারতীয় দূতাবাসে (Indian Embassy) গিয়ে পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি (Power of Attorney) তৈরি করে ভারতের কোনো প্রতিনিধিকে ক্ষমতা দিতে পারেন। সেই PoA ভারতে আসার পর ডিস্ট্রিক্ট রেজিস্ট্রার দ্বারা ভ্যালিডেট করাতে হয়।
প্রশ্ন: দলিলের খসড়ায় (Draft) ভুল থাকলে কীভাবে সংশোধন করব?
উত্তর: রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হওয়ার আগে পর্যন্ত অনলাইনে ড্রাফট সংশোধন করা যায়। কিন্তু রেজিস্ট্রি হয়ে গেলে 'Rectification Deed' বা 'ভ্রম সংশোধন দলিল' করতে হয়, যার জন্য আবার স্ট্যাম্প ডিউটি (নূন্যতম) ও ফি লাগে।
প্রশ্ন: রেজিস্ট্রি করা জমি মিউটেশন (নামপত্তন) করা কি বাধ্যতামূলক?
উত্তর: হ্যাঁ, সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক। রেজিস্ট্রি শুধু মালিকানা হস্তান্তর করে, কিন্তু মিউটেশন সরকারি রাজস্ব খাতায় (Land Record) আপনার নাম নথিভুক্ত করে।
প্রশ্ন: আনরেজিস্টার্ড দলিলের কি কোনো আইনি দাম আছে?
উত্তর: Registration Act, 1908 অনুযায়ী, ১০০ টাকার বেশি মূল্যের স্থাবর সম্পত্তির হস্তান্তর রেজিস্ট্রি না হলে আদালতে তা প্রমাণ হিসেবে গ্রাহ্য হয় না।
প্রশ্ন: অ্যাগ্রিমেন্ট ফর সেল (Agreement for Sale) এবং সেল ডিড (Sale Deed) কি এক?
উত্তর: না। অ্যাগ্রিমেন্ট ফর সেল হলো ভবিষ্যতে জমি কেনার চুক্তি। আর সেল ডিড হলো চূড়ান্ত দলিল, যা রেজিস্ট্রির মাধ্যমে মালিকানা হস্তান্তর করে।
প্রশ্ন: স্ট্যাম্প ডিউটি কি রিফান্ড (Refund) পাওয়া যায়?
উত্তর: যদি পেমেন্ট করার পর কোনো কারণে রেজিস্ট্রেশন বাতিল হয়ে যায়, তবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে IGR পোর্টালের মাধ্যমে রিফান্ডের আবেদন করা যায় (Cancellation of e-Assessment)।
প্রশ্ন: আধার কার্ড কি একদম বাধ্যতামূলক?
উত্তর: পরিচয় প্রমাণের জন্য যেকোনো সরকারি আইডি চলে (যেমন ভোটার কার্ড)। তবে বায়োমেট্রিক অথেন্টিকেশনের সুবিধার জন্য ই-নথিকরণে আধার কার্ড অত্যন্ত কার্যকরী।
প্রশ্ন: জয়েন্ট ওনারশিপের (যৌথ মালিকানা) ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন ফি কি বাড়ে?
উত্তর: না, রেজিস্ট্রেশন ফি সম্পত্তির মূল্যের ওপর নির্ভর করে, মালিকের সংখ্যার ওপর নয়।
প্রশ্ন: রেজিস্ট্রেশনের জন্য কি বিক্রেতাকে সশরীরে থাকতেই হবে?
উত্তর: হ্যাঁ, বিক্রেতাকে সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে সশরীরে উপস্থিত থেকে আঙুলের ছাপ ও ছবি দিতে হবে। তবে তিনি যদি কোনো কারণে অক্ষম হন, তবে রেজিস্টার্ড পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি হোল্ডার তার হয়ে কাজটি করতে পারেন।
প্রশ্ন: দলিল সই হওয়ার কতদিনের মধ্যে রেজিস্ট্রি করতে হয়?
উত্তর: Registration Act অনুযায়ী, দলিলে সই (Execution) হওয়ার ৪ মাসের মধ্যে তা রেজিস্ট্রি অফিসে জমা করতে হয়।
প্রশ্ন: বিক্রেতা যদি টাকা নেওয়ার পর রেজিস্ট্রি করতে অস্বীকার করেন?
উত্তর: এক্ষেত্রে ক্রেতা 'Specific Relief Act' অনুযায়ী দেওয়ানি আদালতে (Civil Court) মামলা দায়ের করে বিক্রেতাকে রেজিস্ট্রি করতে বাধ্য করতে পারেন, যদি পেমেন্টের সঠিক প্রমাণ থাকে।




